ইসলাম

যে ৪ কারণে মুহাম্মদ (সা.) একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব

মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই মানুষ এমন একজন পরিপূর্ণ নেতার সন্ধান করে এসেছে, যাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জটিল পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। ইতিহাসের পাতায় বহু মহামানব, দার্শনিক, দিগ্বিজয়ী বীর ও ধর্মপ্রচারকের আবির্ভাব ঘটেছে; কিন্তু তাঁদের জীবনাদর্শ কি সব যুগের ও সর্বস্তরের মানুষের জন্য সর্বজনীন অনুকরণীয় আদর্শ হতে পেরেছে?এই মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের প্রামাণ্য উত্তর উপস্থাপন করেছেন ইতিহাসবিদ ও গবেষক সাইয়েদ সোলাইমান নদভি (রহ.)। কোনো ব্যক্তির জীবনচরিত মানবজাতির জন্য সর্বজনীনভাবে অনুকরণীয় হতে হলে তাতে চারটি বাস্তবসম্মত শর্তের উপস্থিতি অপরিহার্য।.যেকোনো আদর্শ জীবনচরিতের প্রথম ও প্রধানতম শর্ত হলো তার ঐতিহাসিক সত্যতা। যিনি অনুকরণীয় হবেন, তাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা, বাণী, দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মপদ্ধতি নিরেট সত্য হতে হবে; কোনো কাল্পনিক উপাখ্যান, লোকগাথা বা অস্পষ্ট কিংবদন্তি সেখানে থাকতে পারবে না।মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হলো যে বিষয়ের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে সামান্যতম সংশয় থাকে, তাকে অন্তরের গভীর থেকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না।পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বহু ক্ষণজন্মা মনীষীর আগমন ঘটেছে, যাঁদের প্রচারিত নীতিবাক্য চমৎকার ছিল; কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তাঁদের জীবনের প্রকৃত ঐতিহাসিক দিনপঞ্জি হারিয়ে গেছে।তাঁদের জন্ম, শৈশব, পারিবারিক জীবন ও অন্তিম মুহূর্তের নির্ভরযোগ্য কোনো ঐতিহাসিক দলিল আজ আর অবশিষ্ট নেই। ফলে তাঁদের অনুসারীরাও সংশয়হীন বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ চরিত্রকে বাস্তব জীবনে ধারণ করতে পারে না।.নবীজি (সা.) যেভাবে নামাজ পড়তেন.মানবজীবন অত্যন্ত বিস্তৃত, বহুমাত্রিক ও জটিল। মানুষ শুধু কোনো নির্জন মঠের সন্ন্যাসী বা উপাসনালয়ের আনুষ্ঠানিক পূজারি নয়; তাকে একই সঙ্গে সংসার, সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়।বাস্তব জীবনে একজন মানুষ একই সঙ্গে স্বামী, পিতা, প্রতিবেশী, ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিক, সমাজসংস্কারক কিংবা রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকা পালন করে। সুতরাং সর্বজনীন জীবনাদর্শ হতে হলে সেই মহান ব্যক্তির জীবনে এই বিচিত্র ক্ষেত্রগুলোর প্রতিটির স্পষ্ট নির্দেশনা ও বাস্তব নমুনা বিদ্যমান থাকতে হবে।কোনো ব্যক্তি যদি শুধু বৈরাগ্য, সামরিক বিজয় কিংবা কোনো একক ক্ষেত্রে সফল হন, তবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য তিনি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ হতে পারেন না। মানবজীবনের সব শাখা-প্রশাখায় হেদায়েতের আলো পৌঁছাতে জীবনের সর্বাঙ্গীণ পূর্ণাঙ্গতা অপরিহার্য।.একটি আদর্শ শুধু উচ্চমার্গীয় দর্শন, আকাশচুম্বী নীতিবাক্য কিংবা অলীক কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা মানুষের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে না। রক্ত-মাংসের মানুষের সীমাবদ্ধতা, সামর্থ্য ও মানবিক আবেগের সঙ্গে সেই আদর্শের সামঞ্জস্য থাকতে হবে।যিনি আদর্শ উপস্থাপন করবেন, তাঁকে নিজের প্রাত্যহিক জীবনে সেই নীতি ও বিধানগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করে দেখাতে হবে। কঠোর কোনো নীতি শুধু মুখে বলে যাওয়া সহজ; কিন্তু তা রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নিজের জীবনে অনুশীলন করে প্রমাণ করতে হয় যে—তা মানুষের সাধ্যের অতীত কোনো বিষয় নয়।দর্শন যখন বাস্তব আমল বা কর্মে রূপ নেয়, তখনই তা মানুষের অন্তরে স্থায়ী অনুকরণীয় অনুপ্রেরণা তৈরি করে।.মহানবী (সা.) যেভাবে ঘুমাতে বলেছেন.অনুকরণীয় জীবনাদর্শের চতুর্থ অপরিহার্য শর্ত হলো তার চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা। সেই আদর্শ কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা, নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী, ভাষা কিংবা সুনির্দিষ্ট কোনো শতাব্দীর ফ্রেমে বন্দি থাকলে চলবে না।কাল ও স্থানের সমস্ত প্রাচীর ভেঙে তা যেন কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি জনপদের মানুষের আত্মিক ও জাগতিক সংকটের সমাধান দিতে সক্ষম হয়। যুগ পাল্টালেও যেন তার আবেদন কোনোভাবেই মলিন না হয়।.মানবেতিহাসের একমাত্র মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনাদর্শেই এই চার শর্তের শতভাগ বাস্তবায়ন ঘটেছে:নবীজির জীবনের প্রতিটি দিন-রাত, এমনকি তাঁর হাঁটাচলা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, পারিবারিক আচরণ ও নফল ইবাদতের বিবরণও হাদিস ও ‘আসমাউর রিজাল’ (হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনী যাচাইয়ের শাস্ত্র)-এর মাধ্যমে সনদসহ সংরক্ষিত রয়েছে—ইতিহাসে যার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই।তিনি একাধারে এতিম বালক, বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী, আদর্শ স্বামী, স্নেহময় পিতা, বিচক্ষণ সমাজসংস্কারক, সফল সমরনায়ক, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রধান এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। জীবনের এমন কোনো মানবিক স্তর নেই, যেখানে তাঁর অনুপম চরিত্রের বাস্তব উপস্থিতি অনুপস্থিত।তিনি মানুষকে যা কিছু করার নির্দেশ দিয়েছেন, প্রথমে নিজের জীবনে তা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। শত্রুর চূড়ান্ত নিপীড়নে তিনি ক্ষমার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন, আবার রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও সাধারণ মাটির বিছানায় ঘুমিয়ে কৃচ্ছ্র সাধনের প্রায়োগিক প্রমাণ দিয়েছেন।আজ ১৪০০ বছর পেরিয়েও তাঁর সুন্নাহ বিশ্বের প্রতিটি ভৌগোলিক অঞ্চলে, সব ভাষা ও বর্ণের কোটি কোটি মানুষের জীবনে সমানভাবে কার্যকর ও প্রাসঙ্গিক। আধুনিক সভ্যতার নৈতিক সংকটেও তাঁর জীবনই মানবতার চূড়ান্ত আশ্রয়।সূত্র: সাইয়েদ সোলাইমান নদভি, খুতুবাতে মাদ্রাজ, পৃষ্ঠা: ২২-৪১, ইদারায়ে মাতবুয়াতে তলাবা, লাহোর, ১৯৯৫মাহমুদ হাসান ফাহিম : আলেম ও লেখক.নবীজি কেন প্রশ্ন করতে এত উৎসাহ দিয়েছেন

Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/9b65fy6b0h

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *