বাংলাদেশ
‘মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো একটি শব্দও নেই’
‘মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়েছে অভিধান’: অপ্রতিম হত্যার শোকে স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ নেটদুনিয়া
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের কিশোর সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের অকাল প্রয়াণে কেবল একটি পরিবার নয়, গুমরে কাঁদছে গোটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মাত্র ১৩ বছরের এই কিশোরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড জনমনে গভীর ক্ষোভ, হতাশা আর নিরাপত্তার শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে। অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী—সবার একই প্রশ্ন: আমাদের সন্তানরা কি কোথাও নিরাপদ নয়?
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার বিকেলে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছিল অপ্রতিম। কিন্তু সেই যাওয়াই ছিল তার শেষ যাওয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এই মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তার স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার একজন ব্যবসায়ী।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় ফেসবুকে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গণমাধ্যমকর্মী মো. সাইফুল্লাহ রিয়াদ লিখেছেন, ‘বাংলা ভাষায় লাখের বেশি শব্দ থাকলেও একজন মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো একটি শব্দও নেই।’ সাংবাদিক মাইদুল ইসলাম ২০১৫ সালের একটি স্মৃতিচারণ করে অপ্রতিমের শৈশবের ছবি পোস্ট করেছেন। চঞ্চল সেই ছেলেটির এমন বিদায়ে তিনি স্তম্ভিত, যিনি কি না তাঁর প্রিয় শিক্ষকের আদরের সন্তান ছিলেন।
নিরাপত্তাব্যবস্থা ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রুদ্র ইকবালের মতে, অপ্রতিমের বাসা থেকে মরদেহ উদ্ধারের স্থানটি পায়ে হাঁটা পথে মাত্র ৩০ মিনিটের দূরত্ব। নিখোঁজের পর পুলিশ যদি দ্রুত সক্রিয় হয়ে দুই-তিন ঘণ্টা অভিযান চালাত, তবে হয়তো অপ্রতিমকে জীবিত পাওয়া সম্ভব হতো। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন বলে তিনি জানান।
দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাংবাদিক মাসুম কামাল আক্ষেপ করে লিখেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য এদেশে কোনো নিরাপত্তা নেই। অন্যদিকে মনজুর চৌধুরী মরদেহ উদ্ধারের ভাইরাল ভিডিও দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন, ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিন সংরক্ষণের কোনো তোড়জোড় ছিল না, ফলে উৎসুক জনতার ভিড়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এই শোকের আবহে মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সমালোচনা করা ব্যক্তিদেরও তিনি ধিক্কার জানিয়েছেন।
নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে আহনাফ তাহমিদ ও রাজীব আহমেদ লিখেছেন, বিশাল অংকের কর দিয়েও নাগরিককে নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই দেখতে হচ্ছে। পুলিশের সক্ষমতা থাকলেও কেন তা সাধারণের সেবায় কাজে লাগছে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তারা।
অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাও উঠে এসেছে ফরিদা আক্তারের লেখায়। তিনি মনে করেন, এখন বিপদ আসে বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে, যার সহজ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন। সন্তানদের কার সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ছে এবং কখন সচেতন হতে হবে—তা নিয়ে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রয়োজন দেখছেন তিনি।
একই দিনে খুলনায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে সাইফুল ইসলাম সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও মাদক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চরম হতাশা থেকে তাসলিমা বাবলী ও আহমেদ ইশতিয়াকের মতো ব্যবহারকারীরা মন্তব্য করেছেন যে, শিশুদের জন্য এই দেশ আর নিরাপদ নয় এবং এখানে সন্তান লালন-পালন করা এখন এক বিরাট ঝুঁকি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে দুই কিশোরকে আটক করা হয়েছে যাদের বয়স ১৭ বছর। সিসিটিভি ফুটেজে তাদের অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। খোয়া যাওয়া আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।


