শিল্পকলা

বর্ণিল রেখায় রূপের মায়াজাল

রেখায় রেখায় স্মৃতির বুনন: বীরেন সোমের শিল্পভুবন

আশি ছুঁই ছুঁই বয়স, অথচ শিল্পের আঙিনায় তিনি আজও এক চিরতরুণ অভিযাত্রী। বীরেন সোম—বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে এক প্রগাঢ় নিষ্ঠার নাম। দীর্ঘ কয়েক দশকের পথচলায় তিনি নিজেকে কেবল একজন শিল্পী হিসেবেই নয়, বরং শিল্পের এক অতৃপ্ত শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতিপন্ন করেছেন। জলরং, তেলরং, ড্রয়িং কিংবা ছাপচিত্র—সব মাধ্যমেই তাঁর বিচরণ স্বচ্ছন্দ। বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে নান্দনিক অলংকরণ, বীরেন সোমের তুলিতে প্রতিটি মাধ্যমই খুঁজে পেয়েছে নিজস্ব এক অনন্য ভাষা। রেখা, রং আর টেক্সচারের মিতব্যয়ী অথচ জাদুকরী ব্যবহারে তিনি বাস্তবতাকে রূপ দেন এক গভীর অনুভূতির জগতে।

বীরেন সোম কেবল ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ নন; বাংলাদেশের চারুশিল্পের ইতিহাস রক্ষায় তাঁর কলমও সমান সক্রিয়। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে শিল্পীসমাজ’ এবং ‘বাংলাদেশের চিত্রকলার বিকাশ ও আমার অভিযাত্রা’—এই দুই আকর গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল রেখে গেছেন। নিজের চোখের স্মৃতি আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে তিনি যেভাবে নথিবদ্ধ করেছেন, তাতে কেবল শিল্প নয়, উঠে এসেছে বাংলাদেশের আত্মপরিচয় নির্মাণের এক দীর্ঘ পরিক্রমা।

শিল্পীর জীবনের সাথে মিশে আছে এ দেশের উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯৬৬-র ছয় দফা থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি লড়াইয়ে তিনি রাজপথের সহযোদ্ধা। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের নকশাবিদ হিসেবে যেমন দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি তাঁর আঁকা পোস্টার আর ব্যানার আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠেছিল। তাঁর শিল্পকর্মে তাই প্রকৃতি আর লোকজীবনের সমান্তরালে দেশপ্রেম আর মুক্তির আকুতি এক অন্তর্লীন সুরের মতো বেজে ওঠে।

পেশাগত জীবনে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামে কাটানোর সুবাদে উদ্ভিদ আর প্রকৃতির রূপকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর। সেই নিবিড় পর্যবেক্ষণই তাঁর সাম্প্রতিক কাজে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এক সময়কার বাস্তবানুগ অঙ্কনশৈলী এখন রূপান্তরিত হয়েছে প্রাচ্যধর্মী ও অলংকারিক প্রকাশে। ফুল, পাখি আর লতাগুল্ম তাঁর তুলিতে এখন আর নিছক দৃশ্যমান বস্তু নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে মানুষের মনোজগত আর স্মৃতির গভীর প্রতীক।

রাজধানীর লালমাটিয়ার শিল্পাঙ্গন আয়োজিত দ্য ইলিউশন গ্যালারিতে বর্তমানে চলছে তাঁর ১৪তম একক প্রদর্শনী ‘স্টোরিজ অব মেমোরিজ’ বা ‘স্মৃতির গল্প’। এখানে প্রিন্টের ওপর মার্কার, জলরং আর গোয়াশের ব্যবহারে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার চিরচেনা প্রকৃতি আর লোকজ জীবনের রূপক। প্রদর্শনীতে ‘পানাম’ ও ঐতিহ্যনির্ভর সিরিজগুলোতে অতীত আর বর্তমানের এক চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যায়। ২০১৪ সালের পানাম নগরের স্থাপত্য নিয়ে করা পুরোনো কাজের ওপর নতুন করে টেক্সচার আর ডিজিটাল অনুভূতির ছোঁয়া দিয়ে তিনি সময়কে এক সুতোয় বেঁধেছেন। এর পাশাপাশি আহসান মঞ্জিল আর পানাম নগরের জলরং ও ওয়াশের কাজগুলো ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষকে দিয়েছে এক রহস্যময় প্রাণ।

বিশেষভাবে নজর কাড়ে তাঁর ‘ব্ল্যাক’ সিরিজ। কালো জমিনে সোনালি-রুপালি বলপেন আর প্যাস্টেলের টানে বাউল, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ভেনাসের মতো বিষয়গুলো অনন্য প্রতীকী ব্যঞ্জনা পেয়েছে। সূক্ষ্ম রেখা আর হ্যাচিংয়ের খেলায় তিনি নির্মাণ করেছেন আলো-ছায়ার এক মায়াবী জগৎ। যেখানে মানুষের অবয়বের ওপর লতাপাতার উপরিপাতন কিংবা নৈশ প্রকৃতির পটভূমিতে নতজানু মানুষের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য আর নশ্বর সম্পর্কের কথা।

শিল্পী রশিদ চৌধুরী একবার বলেছিলেন, বীরেন সোম ফুলের মাঝে আস্ত এক নিসর্গ খুঁজে পান। সেই সত্য আজও তাঁর কাজে দীপ্যমান। কবি শামসুর রাহমান তাঁকে অভিহিত করেছিলেন এক নিরলস ও প্রচারবিমুখ শিল্পী হিসেবে। শিল্পগুরু কাইয়ুম চৌধুরীও চার দশক আগে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রশংসা করেছিলেন। আজকের এই প্রদর্শনী যেন সেই আজীবন সাধনারই এক পরিণত নির্যাস।

প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ক্যানভাসে আঁকা ‘রেড ফ্যান্টাসি’। এটি প্রমাণ করে শিল্প তাঁর কাছে কোনো শেষ গন্তব্য নয়, বরং প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের এক অবিরাম প্রক্রিয়া। তাঁর প্রতিটি রেখায় বাংলার শাশ্বত রূপ আর জীবনবোধের যে স্পন্দন, তা দর্শককে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

৫ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া বীরেন সোমের এই বর্ণিল প্রদর্শনীটি আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।

Source: https://www.prothomalo.com/onnoalo/arts/cg64r0r077

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *