ইসলাম

ক্ষুধা দূরীকরণে ইসলামের বাস্তবমুখী ৫ পদক্ষেপ

ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের ৫টি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক উদ্বেগজনক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ প্রতি রাতে রিক্ত উদরে ঘুমাতে যায়। এটি এক করুণ পরিহাস যে, বিশ্বে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাদ্য উৎপন্ন হওয়া সত্ত্বেও শুধু অপচয় আর অব্যবস্থাপনার কারণে কোটি কোটি মানুষ অন্নাভাবে ভুগছে। ইসলাম এই সংকটকে নিছক কোনো বৈষয়িক সমস্যা মনে করে না, বরং খাদ্য নিরাপত্তাকে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং মহান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছে। ক্ষুধা নিবারণে ইসলামের দেওয়া সুশৃঙ্খল ও বাস্তবসম্মত পাঁচটি পথ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. জীবিকা অন্বেষণকে ইবাদতের মর্যাদা প্রদান

ইসলামে অলসতার কোনো স্থান নেই। নিজের ও পরিবারের জন্য রুজি-রোজগার করাকে কেবল জাগতিক কাজ নয়, বরং ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘সালাত শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) তালাশ করো।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ১০)। তিনি আরও বলেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন, কাজেই তোমরা এর দিগন্ত-প্রান্তরে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক ভক্ষণ করো।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১৫)। এমনকি কর্মঠ মানুষের পরিশ্রমকে আল্লাহর পথে জিহাদের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। একবার এক শক্ত সামর্থ্য যুবককে দেখে সাহাবিরা আফসোস করলে আল্লাহর রাসুল (সা.) তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করে বলেন, সে যদি নিজের বৃদ্ধ পিতা-মাতা, ছোট সন্তান বা নিজেকে মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে বাঁচাতে পরিশ্রম করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে (তাবারানি, হাদিস: ২৮২)।

২. কর্মবিমুখতা ত্যাগ ও আত্মনির্ভরশীলতা

আল্লাহর ওপর ভরসা বা ‘তাওয়াক্কুল’ মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘পাখিরা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে নীড়ে ফেরে। তোমরা যদি যথাযথ তাওয়াক্কুল করতে, তবে তোমাদেরও পাখির মতো রিজিক দেওয়া হতো।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)। অর্থাৎ পাখিকে আহার পেতে ডানা মেলে আকাশে উড়তে হয়। স্বহস্তে উপার্জনকে সর্বোত্তম ঘোষণা করে মহানবী (সা.) দাউদ (আ.)-এর উদাহরণ দিয়েছেন এবং অন্যের কাছে হাত পাতার চেয়ে বনে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করাকে বহুগুণ সম্মানের কাজ বলে অভিহিত করেছেন (বুখারি, হাদিস: ২০৭২, ১৪৭১)।

৩. শ্রমিকের নায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ

ক্ষুধা দূর করার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শ্রমের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা। শ্রমিকের পাওনা আটকে রেখে বা তাদের শোষণ করে কোনো সমাজ কখনো ক্ষুধা ও অভাবমুক্ত হতে পারে না। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবেন, যে কোনো শ্রমিককে দিয়ে কাজ করিয়ে নেয় অথচ তার পারিশ্রমিক দেয় না (বুখারি, হাদিস: ২২২৭)। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে মজুরি প্রদানের মূলমন্ত্রই হলো একটি দারিদ্র্যমুক্ত অর্থনীতি গড়ার ভিত্তি।

৪. অপচয় রোধ ও পরিমিতিবোধ

বর্তমান বিশ্বের খাদ্যসংকট যতটা না উৎপাদনের অভাবে, তার চেয়ে বেশি সম্পদের অপচয়ের কারণে। ইসলাম অপচয়কে গর্হিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পবিত্র কোরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা—‘তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)। অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা মানুষের বিবেককে সতর্ক করার জন্য যথেষ্ট (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)।

৫. সুস্থ জীবন ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস

অতিরিক্ত আহার অনেক সময় অন্যের হকের ওপর আঘাত হানে এবং শরীরকে রোগাক্রান্ত করে। বিশ্বনবী (সা.) শিখিয়েছেন পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার, এক-তৃতীয়াংশ পানি এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখতে (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)। এমনকি শিকার করা পাখির আহারযোগ্য অংশ নষ্ট না করতেও কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (নাসায়ি, হাদিস: ৪৩৪৯)। পরিমিত খাওয়ার এই সুন্নাহভিত্তিক অভ্যাস একদিকে যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয়, অন্যদিকে খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় চাহিদা কমিয়ে অভাবী মানুষের মুখে আহার তুলে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।

পরিশেষে বলা যায়, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মতো বৈশ্বিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে ইসলামের এই মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দর্শনের কোনো বিকল্প নেই। নবীজির সেই অমিয় বাণী আমাদের পাথেয় হওয়া উচিত—‘যার পরিবার নিরাপদ, শরীর সুস্থ এবং কাছে এক দিনের খাবার আছে, সে যেন গোটা পৃথিবীটাই হাতের মুঠোয় পেয়ে গেল।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৬)।

Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/u1carwdzw4

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *