সম্পাদকীয়সাহিত্য
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা, ইগোর লড়াই এবং ভঙ্গুর রেফারেল সিস্টেম: বলির পাঁঠা সাধারণ রোগী
মো:শাহাদাত হোসেন তৌহিদ -সম্পাদক বজ্রধ্বনি

বাংলাদেশের অন্যতম সুনামধন্য ফিজিওথেরাপিস্ট ও রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ ডা: মোহাম্মদ আলাউদ্দীন (ফিজিওথেরাপিস্ট, সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল এবং সাবেক গ্যাজেটেড অফিসার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট ও রেফারেল চার্ট (Treatment & Referral Guide)’ চিত্রটির দিকে তাকালে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি সুশৃঙ্খল ও বৈজ্ঞানিক রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ঘাড় থেকে হাতে ব্যথার ১২টি জটিল কন্ডিশনের চিকিৎসা, ফিজিওথেরাপি প্রয়োগ এবং সঠিক সময়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করার একটি চমৎকার গাইডলাইন এখানে নির্দেশ করা হয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কোনো একক পেশাজীবীর একচ্ছত্র আধিপত্যের জায়গা নয়; এটি একটি মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি টিমওয়ার্ক। এখানে যেমন নিউরো সার্জন বা অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের ভূমিকা রয়েছে, তেমনি ফিজিওথেরাপিস্ট, পেইন স্পেশালিস্ট, ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজিস্ট এবং নিউরোলজিস্টদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি নির্ধারিত।
বিশ্বের যেকোনো উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ‘রেফারেল সিস্টেম’ হলো মূল ভিত্তিস্তম্ভ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আজ ডা: মোহাম্মদ আলাউদ্দীনের নির্দেশিত এই বৈজ্ঞানিক রেফারেল ব্যবস্থার ধার ধারে না। চিকিৎসাসেবার পেশাদারিত্বের জায়গায় ভর করেছে ব্যক্তিস্বার্থ, পেশাগত অহংকার বা ‘ইগো’, এবং অদৃশ্য মাফিয়াতন্ত্র।
১. ‘হামসে বাড়া কৌন’ এবং পেশাগত সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স
আমাদের দেশে চিকিৎসাসেবার সাথে যুক্ত বিভিন্ন পেশাজীবীদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিযোগিতা ও অহংবোধ দেখা যায়— “হামসে বাড়া কৌন!”
“আমি সবার সুপেরিয়র, বাকি সবাই ইনফেরিয়র।”
“কে ডক্টর লিখল, কে ফিজিওথেরাপি লিখল, কে গ্রাজুয়েট আর কে কোয়াক”— এই বাহাস আর পদবীর লড়াইয়েই পার হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সময়।
একজন রোগী যখন তীব্র ঘাড়ের ব্যথা বা নার্ভের সমস্যায় ভোগেন (যেমন: Cervical Radiculopathy, Discogenic Radiculitis বা Carpal Tunnel Syndrome), তখন তার দরকার সঠিক সময়ে সঠিক প্রোটোকল অনুযায়ী চিকিৎসা পাওয়া। ডা: মোহাম্মদ আলাউদ্দীন স্যারের প্রস্তুতকৃত চার্টে স্পষ্ট দেখা যায়, কিছু কন্ডিশনে কনজারভেটিভ কেয়ার ও প্রাথমিক ফিজিওথেরাপি দরকার, আবার পেশির দ্রুত ক্ষয় বা নিউরোলজিক্যাল ডেফিসিট দেখা দিলে অবিলম্বে সার্জন বা বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, রোগী যার কাছেই যান—তিনিই রোগীকে নিজের কাছে আঁকড়ে রাখতে চান। ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে গেলে তিনি সার্জনকে এড়াতে চান, আবার স্পেশালিস্ট ডাক্তারের কাছে গেলে অনেক সময় ফিজিওথেরাপির বৈজ্ঞানিক ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়া হয়। পেশাগত সুপিরিয়রিটির এই নোংরা লড়াইয়ে আখেরে ক্ষতি হচ্ছে নিরীহ রোগীদের।
২. সঠিক চিকিৎসার অভাব ও পঙ্গুত্বের দিকে ধাবমান রোগীরা
স্বাস্থ্যসেবার এই বৈষম্য ও সমন্বয়হীনতার খেসারত দিচ্ছে দেশের খেটে খাওয়া ও সাধারণ মানুষ।
সঠিক রেফারেলের অভাব: যে রোগটি উপযুক্ত সময়ে ফিজিওথেরাপি বা কনজারভেটিভ কেয়ারে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যেত, ভুল বা বিলম্বিত চিকিৎসার কারণে তা স্থায়ী পঙ্গুত্বে রূপ নিচ্ছে।
কোয়াকদের রমরমা ব্যবসা: প্রপার রেফারেল গাইডলাইন না থাকা এবং মূলধারার চিকিৎসকদের পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির সুযোগে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে তথাকথিত ‘কোয়াক’ বা ভুয়া চিকিৎসকরা। সঠিক গাইডলাইন না পেয়ে দিশেহারা রোগীরা প্রলোভনে পড়ে ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছে এবং নিজেদের স্বাস্থ্য ও অর্থ দুটোই খোয়াচ্ছে।
অহেতুক অস্ত্রোপচার বা ভুল ওষুধ: সময়মতো রেফার না করার ফলে সাধারণ মেকানিক্যাল ব্যাক পেইন বা নেক পেইন জটিল আকার ধারণ করছে, যার শেষ পরিণতি হচ্ছে ভুল ওষুধ প্রয়োগ বা অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার।
৩. স্বাস্থ্যখাতের মাফিয়াতন্ত্র এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা
প্রশ্ন ওঠে, আমাদের চিকিৎসা সেবায় আসলে মাফিয়া হিসেবে কে বা কারা বসে আছে?
মেডিকেল সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, প্রেসক্রিপশন বাণিজ্য এবং পেশাগত অহংকার—এসবের সমন্বয়ে যে অদৃশ্য মাফিয়াতন্ত্র গড়ে উঠেছে, তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। পেশেন্ট সেন্ট্রিক (Patient-centric) চিকিৎসার পরিবর্তে এখানে তৈরি হয়েছে বিজনেস সেন্ট্রিক বা ইগো-সেন্ট্রিক ব্যবস্থা।
একটি সুস্থ রেফারেল চেইন থাকলে:
১. প্রাথমিক সেবাদাতা প্রপার অ্যাসেসমেন্ট করবেন।
২. ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হলে ফিজিওথেরাপি স্পেশালিস্টের কাছে পাঠাবেন।
৩. সার্জারি বা ব্লক ইনজেকশন/RFA প্রয়োজন হলে সাথে সাথে পেইন বা স্পাইন সার্জনের কাছে রেফার করবেন।
কিন্তু এই চেইন পুরোপুরি অকার্যকর। ফলে রোগী এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতে ঘুরতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং শারীরিক সামর্থ্য হারায়।
৪. সাবলম্বীদের বিদেশমুখিতা: দেশের কোটি কোটি টাকার রক্তক্ষরণ
চিকিৎসা ব্যবস্থার এই ভঙ্গুর দশা এবং পারস্পরিক অনাস্থার চূড়ান্ত ফলাফল হলো দেশের প্রতি আস্থা হারানো। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে—সেই সাবলম্বী ও বিত্তবান শ্রেণী সামান্য চিকিৎসার জন্যও ব্যাংকক, ভারত, বা সিঙ্গাপুরমুখী হচ্ছেন।
দেশের কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে।
দেশের স্বাস্থ্যখাত এবং ডা: মোহাম্মদ আলাউদ্দীন স্যারের মতো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের প্রোটোকল ও মেধা থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক সিস্টেমের কারণে রোগীরা বিশ্বস্ততা হারিয়ে ফেলছে।
আর যাদের বিদেশে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, সেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা দেশে ভুল চিকিৎসা ও সমন্বয়হীনতার শিকার হয়ে পঙ্গুর খাতায় নাম লেখাচ্ছেন।
উপসংহার ও উত্তরণের পথ
একটি জাতির স্বাস্থ্যসেবা তখনই কার্যকর হয়, যখন পেশাজীবীরা নিজেদের ‘সুপিরিয়রিটি’ ভুলে ‘রোগীর কল্যাণ’ (Patient Benefit)-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন।
ডা: মোহাম্মদ আলাউদ্দীন স্যারের প্রস্তুতকৃত এই গাইডলাইন চার্টটি মুলত স্যারের তৈরি চার্ট বলা ভুল হবে এটা আন্তর্জাতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি রেফারেল সিস্টেম। চার্টটির মতো সুস্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক প্রোটোকল প্রতিটি হাসপাতাল ও চেম্বারে বাধ্যতামূলক করা উচিত। কাকে কখন কনজারভেটিভ চিকিৎসা দিতে হবে, কখন ফিজিওথেরাপি দিতে হবে এবং কখন সার্জন/বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করতে হবে—এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা জরুরি।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—রোগী কোনো আয়ের মাধ্যম বা অহংকার প্রকাশের উপাদান নয়। রোগী একজন মানুষ, যে সঠিক চিকিৎসার অধিকার নিয়ে আমাদের কাছে আসে। ইগোর লড়াই বন্ধ করে প্রপার রেফারেল সিস্টেম চালু না করলে, দেশের স্বাস্থ্যখাত যে খাদে পড়ছে, তা থেকে উত্তরণ অসম্ভব।