বাণিজ্য
বনরুটির দাম বাড়ল ৫ টাকা, শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট বেড়েছে

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকার বাসিন্দা মো. আলমগীর পেশায় রিকশাচালক। সকাল-বিকেল মিলিয়ে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা পায়ে টানা রিকশা চালান তিনি। কষ্টের এই কাজের ফাঁকে দিনে তিন-চারবার টুকটাক নাশতা খেতে হয় তাঁকে। প্রতিবার অন্তত একটি বনরুটি ও এক কাপ চা খান তিনি। এত দিন প্রতিবার নাশতায় আলমগীরের খরচ হতো ২০ টাকা। এর মধ্যে বনরুটি ১০ টাকা ও দুধ চা ১০ টাকা। কিন্তু গত রোববার থেকে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ টাকায়। কারণ, বাজারে বনরুটির দাম পিসপ্রতি ৫ টাকা বেড়েছে। রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকাতেই এখন বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বেকারির তৈরি খোলা পাউরুটি (বনরুটি নামে পরিচিত) ও কেক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাইরেও বেশ কিছু অঞ্চলে রুটি-কেকের দাম বেড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় দাম না বাড়লেও রুটি ও কেকের আকার ও ওজন (পরিমাণ) কামানো হয়েছে।.বেকারি মালিকেরা জানিয়েছেন, গত দেড়-দুই বছরে ময়দা, চিনি, ডালডা, সয়াবিন তেল, গ্যাসসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। এ কারণে তাঁরাও ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দাম বাড়িয়েছেন।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, গত আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। এমনিতে বাজারে মাছ, মাংস, সবজি, তেল, চিনি প্রভৃতি নিত্যসামগ্রীর দাম আগের তুলনায় বেশি। সেখানে রুটি, কেকের মতো বেকারি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচের পাল্লা আরও কিছুটা ভারী হয়েছে নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের।রিকশাচালক আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুইডা খেপ (ভাড়া) মাইরা একটা রুটি, একটা চা খাওনই লাগে। না হয় শরীরে বল (শক্তি) পাই না। কিন্তু এহন খরচ ৫ টেয়া বাড়ছে।’.কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে গত শনিবার থেকে রুটির দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি। সংগঠনটি জানিয়েছে রুটি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের দাম এবং ওজন সমন্বয় করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে।ব্যবসায়ীরা জানান, হাতে তৈরি বেকারি বিস্কুটের দাম কেজিতে গড়ে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগে সাধারণ মানের যেসব বিস্কুট ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, তা বর্তমানে ১৫০ টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে, বনরুটি ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ওজনেও পরিবর্তন এনে সমন্বয় করা হয়েছে। আগে যেসব বনরুটি ও মাফিন কেকের ওজন ৪০ গ্রাম ছিল, সেগুলোর দাম একই রেখে ওজন কমিয়ে ৩৫ গ্রাম করা হয়েছে। আবার ১০ বা ১২ টাকা দামের প্রতি পিছ বনরুটির দাম বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে বনরুটির আকার সামান্য বড় করা হয়েছে।এর আগে দাম বাড়ানোর দাবিতে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার রাজধানীর বেকারি কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল। দুই দিন বন্ধ থাকার পর নতুন নির্ধারিত মূল্যে শনিবার সকাল থেকে বাজারে বেকারি পণ্য সরবরাহ করেছে বেকারিগুলো।.রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, মগবাজার, খিলগাঁও এলাকায় খোঁজ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে রুটি, কেক বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।অবশ্য ঢাকার বাইরের সব এলাকায় এখনো দাম বাড়েনি। যেমন প্রথম আলোর খুলনা, চট্টগ্রাম ও সাভারের নিজস্ব প্রতিবেদক এবং রাজশাহীর প্রতিনিধি জানান, এসব এলাকায় রোববার পর্যন্ত আগের দামেই বনরুটি, কেক বিক্রি হয়েছে।রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব সড়কের চা বিক্রেতা জব্বার শেখ বলেন, ‘গত এক মাসে চা পাতার দাম কেজিতে ৫০ টাকা বেড়েছে। চিনির দামও আগের তুলনায় কেজিতে ৫-১০ টাকা বেড়েছে। এখন বাড়ল রুটি, কেকের দাম। এমনিতে চায়ের দাম তো আমরা বাড়াতে পারিনি। রুটি, কেকের দাম বৃদ্ধিতে উল্টো আমার বেচাকেনা কিছুটা কমে যেতে পারে।’.বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুসারে, সারা দেশে ক্ষুদ্র বেকারির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৭০০টির বেশি বেকারি।রুটি ও বেকারি পণ্য তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে ময়দা, ভোজ্যতেল, ডালডা ও চিনি। পণ্য তৈরিতে লাগে গ্যাসও।ব্যবসায়ীরা জানান, গত ছয় মাসে প্রতিটি কাঁচামালের দাম বেড়েছে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, ছয় মাস আগের তুলনায় খুচরায় প্রতি কেজি খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, খোলা সয়াবিন ৫ শতাংশ ও চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে।.ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন জানান, গত এক বছরের মধ্যে বিভিন্ন কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ায় বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ বেড়েছে ২০-২৫ শতাংশ। বিপরীতে পণ্য উৎপাদন ১০-১৫ শতাংশ কমেছে। সব মিলিয়ে বড় ধরনের চাপে রয়েছেন দেশের ছোট ও মাঝারি আকারের বেকারি ব্যবসায়ীরা।বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘রুটি ও কেক তৈরির কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই আমরা এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
