বাণিজ্য
নাগরিক জীবনে জমির সংকটের প্রভাব, উপায় কী
প্রতিনিয়ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও জমির পরিমাণ বাড়ছে না। ফলে সীমিত জায়গায় বাড়তি মানুষকে আবাসন, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সেবা দেওয়ার চাপ তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যে শহরের আবাসন, ভবনের ধরন, যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে জমির সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক জীবনে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।জমির সংকট মোকাবিলায় এখন একতলা বা দোতলা বাড়ির জায়গায় তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন। একই জমিতে বেশি মানুষকে আবাসনের সুযোগ দিতে ভবনের উচ্চতা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু একটি ভবনে মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের নাগরিক সুবিধার ওপরও চাপ তৈরি হয়। বাড়ে রাস্তা ও গণপরিবহনে মানুষের চাপ, পানি ও পয়োনিষ্কাশনের প্রয়োজন, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাহিদা।জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সচিব মনদীপ ঘরাই প্রথম আলোকে বলেন, জমির সংকট শুধু আবাসনের সংকট নয়, এটি আমাদের পুরো জীবনযাপনের ওপর প্রভাব ফেলবে। নগরজীবনের পরিকল্পনায় আমাদের সামনে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘সংকটের কথা উঠলেই আমরা সব সময় ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কথা বলি, বিকল্প ব্যবহারের কথা বলি; তবে কম জমিতে কীভাবে বেশি মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, সেটিও আমাদের চিন্তায় রাখতে হবে।’.ছোট হচ্ছে ফ্ল্যাট, বদলাচ্ছে বসবাসের ধরনজমির দাম ও নির্মাণ ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে ফ্ল্যাটের আয়তনেও। বড় আয়তনের ফ্ল্যাট অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় তুলনামূলক ছোট ফ্ল্যাটের দিকে ঝুঁকছেন অনেক ক্রেতা। ফলে সীমিত জায়গার মধ্যে পরিবারের প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো কীভাবে রাখা যায়, সেটি আবাসন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। ছোট ফ্ল্যাট মানেই যে বসবাসের সুযোগ কমে যাবে, তা নয়।বরং প্রয়োজন হচ্ছে জায়গার ব্যবহার আরও পরিকল্পিত করে তোলার। কোন ঘর কীভাবে ব্যবহার হবে, কোথায় আসবাব রাখা হবে, একই জায়গা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, এসব বিষয়ও আবাসনের নকশায় গুরুত্ব পাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়লে মানুষের আবাসন-চাহিদার ধারণাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বড় আয়তনের বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পিত জায়গাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।.ব্যক্তিগত ব্যবহারের বদলে বাড়বে যৌথ সুবিধাজমির সংকটের আরেকটি সম্ভাব্য পরিবর্তন নাগরিক সুবিধার ব্যবহারে। প্রতিটি ভবন বা আবাসিক ইউনিটের সঙ্গে আলাদা করে সব ধরনের সুবিধা রাখার বদলে কিছু সুবিধা যৌথভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একটি আবাসিক এলাকায় শিশুদের খেলার জায়গা, হাঁটার জায়গা, ব্যায়ামের স্থান কিংবা কমিউনিটি স্পেস একাধিক পরিবারের মানুষ ব্যবহার করতে পারেন।এতে সীমিত জমির মধ্যে তুলনামূলক বেশি মানুষের জন্য সুবিধা তৈরি করা সম্ভব। তবে এ ধরনের যৌথ সুবিধা কার্যকর করতে শুধু জায়গা বরাদ্দ করলেই হবে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ঘনবসতিপূর্ণ শহরে মানুষের প্রয়োজন শুধু থাকার জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন ও অবসর কাটানোর সুযোগও নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।.জমির সংকট মোকাবিলায় করণীয়সীমিত জমির মধ্যে বসবাসযোগ্য শহর নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে দখল হয়ে থাকা সরকারি জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার ওপর। বিষয়টি উল্লেখ করে মনদীপ ঘরাই বলেন, এ জন্য একটি ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির যে উদ্যোগ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার মধ্যে ভারসাম্যও রক্ষা করতে হবে।মনদীপ ঘরাই আরও বলেন, শহরের বাইরের এলাকাগুলোকে শহরের মতোই বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে কাজের জন্য মানুষকে প্রতিদিন শহরের কেন্দ্রে আসতে না হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সেবা ও কর্মক্ষেত্র যদি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সীমিত সম্পদের মধ্যেই সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে আরও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব।সংশ্লিষ্টদের মতে, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে গিয়ে যেন উন্মুক্ত জায়গা ও নাগরিক সুবিধা কমে না যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের নগর–পরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু কম জমিতে বেশি মানুষকে বসবাসের সুযোগ দেওয়া নয়; বরং জমির ব্যবহার, জনঘনত্ব ও নাগরিক অবকাঠামোর মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। রাজধানীতে জমির সংকট বাড়ায় আবাসনের জন্য ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব এলাকায় নতুন প্রকল্প ও আবাসনের সুযোগ সম্পর্কে ক্রেতাদের ধারণা দিতে আবাসন মেলার মতো আয়োজনও ভূমিকা রাখছে।



