যুক্তরাষ্ট্র

প্রেসিডেন্ট সিকে প্রথা ভেঙে স্বাগত জানালেন ট্রাম্প, সম্পর্কের বরফ কি গলবে

প্রথা ভেঙে ট্রাম্পের রাজকীয় অভ্যর্থনা: ওয়াশিংটনে সি চিন পিং, সম্পর্কের মেরুকরণ কি বদলাবে?

দীর্ঘ তিন বছরের বিরতি ভেঙে আবারও ওয়াশিংটনের মাটিতে পা রাখলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। তবে এবারের সফর কেবল কূটনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং শুরুতেই তৈরি করেছে এক নতুন ইতিহাস। ম্যারিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সি চিন পিং ও ফার্স্ট লেডি পেং লিউয়ানকে স্বাগত জানাতে প্রথা ভেঙে সরাসরি উপস্থিত হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্প। সামরিক ব্যান্ডের সুর, কামানের গর্জন আর আকাশে বি-১ বোমারু বিমানের মহড়ায় এক রাজকীয় আবহ তৈরি হয় সেখানে। প্রায় ১১ বছর পর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে সশরীরে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট; এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালে পোপ ফ্রান্সিসের জন্য বারাক ওবামা এমন সৌজন্য দেখিয়েছিলেন।

দুই পরাশক্তির এই সাক্ষাৎকে বিশ্বরাজনীতির এক অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বাণিজ্য সংঘাত, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব, তাইওয়ান সংকট আর ইরান ইস্যু—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ এখনও তুঙ্গে। যদিও এই সফর থেকে রাতারাতি বড় কোনো পরিবর্তনের আশা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা, তবে স্থবির হয়ে থাকা বাণিজ্য আলোচনায় প্রাণের সঞ্চার হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত ১১ মাস ধরে চলা দুই দেশের বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে বেইজিং ও ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, আগামী ১০ নভেম্বর মেয়াদে উত্তীর্ণ হতে যাওয়া এই সমঝোতা ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।

এই কূটনৈতিক উষ্ণতার মধ্যেও সূক্ষ্ম বার্তা দিয়ে রেখেছে চীন। ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাস থেকে সি চিন পিংকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বেইজিং ও ওয়াশিংটনের উচিত প্রতিদ্বন্দ্বীর বদলে অংশীদার হিসেবে কাজ করা। যদিও এই বিবৃতিতে আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য করা হয়নি। বৈশ্বিক বাজারও এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছে চাতক পাখির মতো। ২০২৫ সালের ভয়াবহ শুল্কযুদ্ধের রেশ কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফেরাতে এই সীমিত মেয়াদী সমঝোতা বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার পেছনে অবিশ্বাসের দেয়ালটি এখনও বেশ উঁচু। কম্পিউটার চিপ ও বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ এবং তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অকুণ্ঠ সমর্থন বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে রেখেছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দেশের ভেতর চাপের মুখে রয়েছেন, তখন সি চিন পিং অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেই এই আলোচনায় বসছেন। চীনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ থাকলেও দেশটির বাণিজ্য খাত বর্তমানে বেশ সুসংহত। এদিকে রিপাবলিকান শিবিরের কড়া নজরদারিতে রয়েছেন ট্রাম্প; কারণ দলের ভেতর অনেকেই কমিউনিস্ট চীনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করেন।

বৈঠকের আলোচনায় তাইওয়ান ইস্যুটি বড় হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সি চিন পিং হয়তো তাইওয়ানের ওপর চীনের আধিপত্যের দাবি আবারও তুলবেন, যা ট্রাম্প সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার নিয়েও দুই নেতার মধ্যে কথার লড়াই হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে চীন কতটা সহযোগী হবে, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। লাল গালিচা বিছানো এই অভ্যর্থনা কি দুই পরাশক্তির সম্পর্কের তুষারপাত গলাতে পারবে, নাকি এটি কেবলই একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা—তা সময়ই বলে দেবে।

Source: https://www.prothomalo.com/world/usa/igz48s2yf9

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *