ইউরোপ
যুদ্ধাপরাধের দায়ে কসোভোর সাবেক প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচির ২৫ বছরের কারাদণ্ড

যুদ্ধাপরাধের দায়: ২৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত কসোভোর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হাশিম থাচি
নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৫৮ বছর বয়সী হাশিম থাচি। এক সময় যিনি ছিলেন কসোভোর স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতাপশালী রাষ্ট্রপ্রধান, সেই হাশিম থাচিকে এবার যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২৫ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। বুধবার ‘কসোভো স্পেশালিস্ট চেম্বার্স’ (কেএসসি) এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে। বিচারক চার্লস স্মিথ যখন দণ্ডাদেশ পড়ছিলেন, তখন থাচিকে ভাবলেশহীন দেখালেও শুরু থেকেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে সার্বিয়ার শাসন থেকে মুক্তি পেতে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে মেতেছিল কসোভো লিবারেশন আর্মি (কেএলএ)। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১৯৯৮-৯৯ সালের সেই সংঘাতের সময় কেএলএ-এর শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কমান্ডার হিসেবে থাচি সরাসরি যুদ্ধাপরাধ, নির্যাতন এবং বেআইনি আটকের মতো ঘটনায় জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে নিজ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সার্বীয় বাহিনীর তথাকথিত সহযোগীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের দায়ভার তাঁর ওপর বর্তায়। রায়ে উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধ চলাকালীন অন্তত ৯৬ জন বেসামরিক নাগরিক ও রাজনৈতিক বিরোধীকে হত্যার ঘটনায় থাচি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
আলোচিত এই মামলায় থাচির পাশাপাশি তাঁর তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকেও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কেএলএ-এর প্রাক্তন অধিনায়ক ইয়াকুপ ক্রাসনিকিকে ২৫ বছর, কাদ্রি ভেসেলিকে ১৮ বছর এবং রেঝেপ সেলিমিকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে প্রসিকিউশন পক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধের আরও ছয়টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে না পারায় অভিযুক্তদের সেসব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
এই রায় ঘোষণার পরপরই কসোভো এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। কসোভোর সংখ্যাগরিষ্ঠ আলবেনীয় জনগোষ্ঠীর কাছে থাচি একজন কিংবদন্তি বীর। রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানী প্রিস্টিনায় হাজার হাজার ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন এবং আদালতের এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। কসোভোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্লাউক কোনজুফকা এই রায়কে ‘ভয়াবহ এবং কসোভোর অস্তিত্বের জন্য চরম ক্ষতিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেগের আদালতের একটি ছবির পাশে আলবেনীয় ভাষায় ‘মারে’ (লজ্জা) লিখে নিজের তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেন।
বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে সার্বিয়া। এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে সার্বিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ইভিকা দাচিচ বলেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে এটিই প্রমাণিত হলো যে কেএলএ মূলত একটি অপরাধী সংগঠন ছিল। নিহত সার্বিয়ানদের গণকবরের ওপর কোনো বৈধ রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না।’
উল্লেখ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে হাশিম থাচি কসোভোর প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সবশেষে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালে যখন আন্তর্জাতিক আদালত তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন, তখন তিনি সম্মান রক্ষার্থে পদত্যাগ করে হেগে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। স্বাধীনতার নায়ক থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাঁর এই পতনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিল।