কবিতা

ঠোঁট চুম্বন ছাড়া আর কোনো ভাষা শেখেনি

অধর চুম্বন ব্যাতীত কোনো বর্ণমালা শেখা হয়নি

অধর ছুঁয়ে থাকার বাইরে অন্য কোনো ভাষা বা ব্যাকরণ আয়ত্ত করা হয়ে ওঠেনি। যা ঘটার তা বহু আগেই সম্পন্ন হয়েছে। জগতের মানুষ এখন মৃত্যুকেও উদযাপনের অংশ করে নিয়েছে, তাই শিউরে ওঠার অবকাশটুকু নেই। দূরত্ব স্রেফ পদার্থবিজ্ঞানের এক গোলকধাঁধা ছাড়া আর কিছু নয়। এই ব্যবধান মেটানোর বৃথা চেষ্টা না করে বরং অন্যের পথে হেঁটেই নিজের গন্তব্যে পৌঁছাতে চাই। তবু এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু আছে যে, কেউ হাত বাড়ালে তার হাতটি ধরতে হয়।

স্মৃতির পাতায় এই বোধটুকু স্পষ্ট—চুম্বনের পর কোনো নারী আর অনাত্মীয়ের কাতারে থাকে না।

মায়ের অসুস্থতার দিনগুলোতে স্রষ্টার কাছে কেবল একটাই চাওয়া ছিল—স্বস্তি ফিরে আসুক। হৃদয়ে যখন কাফের হওয়ার আশঙ্কা জাগত, তখনই বুঝতাম শান্তির পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। তন্দ্রা আর নিবিড় ঘুমের ভেতরেও যে বিস্তর ফারাক থাকে, তা তখন টের পেয়েছি। ‘মা ঘুমোচ্ছেন’—এই টুকু খবরেই এক চিলতে শান্তি খুঁজে নিতাম। জেগে থেকে তাঁকে পাহারা দেওয়ার সময় নিজের চোখকে ক্রমাগত শাসন করতাম যেন ক্ষণিকের অবহেলাও ছায়া না ফেলে। সিঁদেল চোর তো বটেই, এমনকি কাছের মানুষও অনেক সময় চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। মায়ের সেবায় রাত জাগা ছিল যেন মর্ত্যের জান্নাত। গভীর রাতে যখন তাঁর তন্দ্রা ছুটত, তখন ক্ষীণ কণ্ঠে জানতে চাইতেন—‘কটা বাজে? এখনো ঘুমাসনি কেন?’ সেই মমতাময় কণ্ঠের দিনগুলো ফুরিয়ে গেছে। মা শুধু বলে গিয়েছিলেন, তাঁর স্বপ্নে এক শিশু বারবার হামাগুড়ি দেয়। মায়ের দেখা সেই স্বপ্নবালকই আজ আমার কোলের সন্তান।

এখন আর রাত জাগলে কেউ মায়া মাখা কণ্ঠে ঘুমিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয় না। অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে, চোখ বিশ্রাম পেলে তবেই প্রকৃতির স্থৈর্য অনুভব করা যায়। পাখিরা যেমন শীতের দাপট থেকে বাঁচতে ঝাঁক বেঁধে আশ্রয়ের খোঁজে আসে, তেমনি মৃত্যুও পাহাড়ের ঢালে অশ্বারোহীর মতো ওত পেতে থাকে। আমরা বুঝতে পারি—শীতের তীব্রতা বাড়লে বিছানাই হয়ে ওঠে শরীরের একমাত্র আচ্ছাদন।

যার ঘরে সাধারণ বসার পিঁড়িটুকু নেই, সে–ও অবলীলায় স্বপ্নে রাজকীয় পালঙ্ক দেখে। আজ বিকেলে নদীর কূলে এক ধীবরের জীবনকাহিনি শুনলাম। সারা গায়ে মাছের ঘ্রাণ লেগে থাকলেও অদ্ভুতভাবে তার ঘরে মাছেরই অভাব। পাথরের মতো ভার বয়ে বেড়ানো মানুষদের বুকের ভেতর যেন পাথরেরই পুনর্জন্ম হয়।

আমি এক আত্মকেন্দ্রিক সত্তা। কখনো সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের তল্লাশি নিতে চাইনি, বরং তাদের থেকে সুযোগ গ্রহণ করেছি অনবরত। বিরোধাভাসে ভরা এক লোভী মনের অধিকারী আমি। অথচ এতটুকু উপলব্ধির পরেও কখনো শিয়রের বালিশকে জিজ্ঞেস করা হয়নি যে, তার রাতে ঘুম আসে কি না।

অন্তরে ভালোবাসা না পুষে আজ পর্যন্ত কাউকে চুম্বন করিনি—নিজের সত্তার সঙ্গে এইটুকু সততা বজায় রেখেছি।

পাখিদের কলকাকলিতে আমি অনেক বেলা কাটিয়েছি। ভোরের আলো যখন দ্বিধা ঝরিয়ে তোমাকে পূর্ণরূপে প্রকাশিত করে, তখন নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। প্রতিটি অনিশ্চিত দিন কতই না দোদুল্যমান, তবু আমরা দীপ্তিময়; আমাদের অকৃত্রিম হাসি সেই দীপ্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পাখিরা জেগে ওঠার আগের সুরটি আমার প্রিয়। কেন তোমার কাছে বারবার ফিরে আসি? এই প্রশ্নের উত্তরে শুধু বলা যায়—তোমাকে ছাড়া আমার অন্য কোনো গন্তব্য নেই।

তোমার থেকে পাওয়া সেই চুম্বনগুলো আমি আমার ছেলের কপালে মেখে দিয়েছি। গভীর রাতে যখন পিঠ ঘামিয়ে ঘুম ভেঙে যায়, তখনও মনে মনে সংকল্প করি—ভবিষ্যতে আমার যত কন্যাসন্তান হবে, তাদের সবার নাম রাখব তোমার নামে।

Source: https://www.prothomalo.com/onnoalo/poem/dul5hzkbu6

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *