শিল্পকলা

ক্যানভাসে নারীর কণ্ঠস্বর

রঙের তুলিতে নারীসত্তার স্পন্দন: ‘লবঙ্গলতিকা’র সৃজনগাথা

আদিমকাল থেকেই মানুষ তার মনের গহন কথাকে মূর্ত করে তুলেছে শিল্পের ভাষায়। রেখা, রঙ আর অবয়বের সেই জাদুকরী বিন্যাস কখনো কখনো শব্দের সীমানাকেও ছাড়িয়ে যায়। যদিও সমকালীন শিল্পকলায় ‘কনসেপ্ট নোট’ বা ধারণাপত্র একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবুও শিল্পের সার্থকতা তো মূলত তার দৃশ্যমান নান্দনিকতায়। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা কিংবা মোনালিসার সেই রহস্যময় হাসিকে বুঝতে কোনো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না; বরং চোখের দেখাই হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। শিল্পের সেই আদি ও অকৃত্রিম দৃশ্যভাষাকে উদ্‌যাপন করতেই সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে এজ গ্যালারিতে শুরু হয়েছে এক অনন্য প্রদর্শনী—‘লবঙ্গলতিকা: কার্টোগ্রাফিস অব দ্য ফেমিনিন’।

এই প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ হলো ২৩ জন খ্যাতিমান ও উদীয়মান নারী শিল্পীর কাজের মেলবন্ধন। ফরিদা জামান, রোকেয়া সুলতানা, কনকচাঁপা চাকমা কিম্বা আইভি জামানের মতো বরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি এখানে স্থান পেয়েছে নবীনদের সৃজনশীলতা। শিল্পী মাকসুদা ইকবাল নিপার ক্যানভাস যেন এক প্রাণময় বিমূর্ততার জগত। তাঁর তুলির আঁচড়ে রঙ শুধু বর্ণিল সাজ তৈরি করে না, বরং সঞ্চার করে এক অদম্য জীবনীশক্তি। ‘অনুভূতির বুনন’ শিরোনামের চিত্রে তিনি যেভাবে রঙের পরত আর বুনন দিয়ে এক ধরণের ছন্দ তৈরি করেছেন, তা দর্শককে বিমোহিত করে।

অন্যদিকে, বিপাশা হায়াতের শিল্পকর্মে ধরা দিয়েছে সময় আর স্মৃতির দহন। ম্লান একরঙা পটভূমি আর ভাঙাচোরা রেখায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন অস্তিত্বের এক রহস্যময় মানচিত্র। মসলিন, তার, পাথর আর কার্ডবোর্ডের ব্যবহারে তাঁর কাজগুলো যেন এক একটি প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের গল্প বলে। অন্ধকারের বুক চিরে বেরিয়ে আসা সোনালি আভা সেখানে হয়ে ওঠে টিকে থাকার প্রেরণা। ভাস্কর্য শিল্পেও এই প্রদর্শনী অত্যন্ত সমৃদ্ধ। শিল্পী মুক্তি ভৌমিকের কাজগুলোতে ছোটগল্পের মতো গভীরতা আর মানবিক আবেগের ছোঁয়া পাওয়া যায়। মাটি ও ধাতুর কঠিন কাঠামোতে তিনি বুনে দিয়েছেন কোমল সব অনুভূতি। আইভি জামান, সিগমা হক অংকন, লেখ নেসা খাতুন এবং তারানা হালিমের ভাস্কর্যগুলোও প্রদর্শনীর শক্তিমত্তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।

বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের এক চমৎকার উপস্থাপন দেখা যায় শিল্পী শেখ ফারহানা পারভিন টুম্পার কাজে। গ্রামীণ পুতুলের অবয়ব আর উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে তিনি ক্যানভাসে সাজিয়েছেন গ্রামবাংলার প্রাণের স্পন্দন। শিল্পী নার্গিস পলির কাজে দেখা যায় তাত্ত্বিক গভীরতা আর কারিগরি দক্ষতার নিখুঁত ভারসাম্য। পিছিয়ে নেই নবীন প্রজন্মও। সীমা মণ্ডলের কোলাজধর্মী কাজ কিম্বা তুলসী রানী দাস, শারমিন আক্তার লিনা ও সুবর্ণা মোর্শেদার নিজস্ব ঘরানার শিল্পভাষা আগামীর এক সম্ভাবনাময় বার্তা দেয়।

‘লবঙ্গলতিকা’ কেবল একটি শিল্প প্রদর্শনী নয়, এটি আমাদের শিল্পাঙ্গনে নারী শিল্পীদের জয়যাত্রা ও তাঁদের স্বকীয় সত্তার এক বলিষ্ঠ ঘোষণা। সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতা ডিঙিয়ে রঙের ভুবনে তাঁদের এই পদচারণা প্রমাণ করে যে, সৃজনশীলতার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই শিল্পযজ্ঞ। এছাড়া ২৯ আগস্ট শিল্পীদের সঙ্গে দর্শকদের এক বিশেষ আলাপচারিতার আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে নারীত্ব, স্বাধীনতা ও শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলে প্রাণবন্ত আলোচনা। রাজধানীর এজ গ্যালারিতে গত ১৪ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী দর্শকদের জন্য এক নতুন ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

Source: https://www.prothomalo.com/onnoalo/arts/j8ue07izk4

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *