
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্যের সুরক্ষিত দুর্গে বড়সড় ফাটল ধরাল সাইবার অপরাধীরা। গত ৯ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন ধরে রাজ্য তথ্যকেন্দ্রের (স্টেট ডেটা সেন্টার) সার্ভারে চলেছে অতর্কিত ‘সাইবার হামলা’। এই ঘটনার জেরে রাজ্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নথিপত্র চুরি বা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্প থেকে শুরু করে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংক্রাস্ত অসংখ্য তথ্য এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্য তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তরের অধীনে থাকা এই তথ্যকেন্দ্রটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড’ বা ওয়েবএল। জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রথমবার সার্ভারে অনুপ্রবেশ করে হ্যাকাররা। কিন্তু প্রশাসনের অন্দরে বিষয়টি টের পেতে বেশ কয়েক দিন সময় লেগে যায়। ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে কর্মকর্তারা যখন বিষয়টি বুঝতে পারেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হামলা রোখার চেষ্টা করা হলেও তা খুব একটা কার্যকর হয়নি। পরবর্তী ফরেনসিক তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—টানা পাঁচ দিন ধরে হ্যাকাররা সার্ভারের অন্দরে ম্যালওয়্যার স্ক্রিপ্ট চালিয়েছে।
ম্যালওয়্যার স্ক্রিপ্ট হলো এক প্রকার ক্ষতিকর কোড, যা দিয়ে গোপনে কোনো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বা তথ্য পাচার করা যায়। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অর্থ দপ্তরসহ মোট চারটি দপ্তরের নথিপত্র বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে পূর্বতন সরকারের আমলের বিভিন্ন প্রকল্প, আর্থিক লেনদেনের খতিয়ান এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার মেঘ জমেছে। এমনকি নথিপত্রগুলোর ব্যাকআপ কপিও হ্যাকাররা নষ্ট করে দিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্তে দেখা গেছে, হামলার সময় অন্তত ৫০টি ভার্চ্যুয়াল মেশিন সক্রিয় ছিল, যা এই আক্রমণের ভয়াবহতাকেই স্পষ্ট করে।
এই ডিজিটাল হানার প্রভাব সরাসরি পড়েছে জনপরিষেবার ওপর। পূর্ত দপ্তর, আবাসন, পুলিশ এবং পৌর ও নগর উন্নয়নের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ওয়েবসাইটগুলো এখন কারিগরি সমস্যায় জর্জরিত। অনেক ক্ষেত্রে পোর্টাল পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে, আবার কোথাও ওয়েবসাইটের নেপথ্য কারিগরি কাজ (ব্যাকএন্ড) করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে স্বস্তির খবর এই যে, অর্থ দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমটি হ্যাকারদের কবলে পড়েনি। আপাতত ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র তথ্যভাণ্ডার কতটা সুরক্ষিত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজ্য প্রশাসনের এই স্পর্শকাতর বিপর্যয় নিয়ে সরকারের উচ্চপদস্থ মহলে চাঞ্চল্য ছড়ালেও এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আনন্দবাজার পত্রিকার পক্ষ থেকে তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তার এই বড়সড় ত্রুটি নিয়ে প্রশাসনের অন্দরে এক প্রকার অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছে।