
দুই চোখে পৃথিবী দেখার সুযোগ পাননি জন্মের পর থেকেই। কিন্তু সেই অন্ধকারকে জয় করে তিনি আজ শত শত শিক্ষার্থীর হৃদয়ে শিক্ষার আলো জ্বেলে দিচ্ছেন। তিনি মো. শামসুল ইসলাম, নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের এক লড়াকু প্রভাষক। ক্লাসরুমে তাঁর সাবলীল পদচারণা আর গভীর জ্ঞান দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি দৃষ্টিহীন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শোনা আর প্রযুক্তির সহায়তায় প্রজেক্টরে পাঠদান—সবই সামলান নিপুণ হাতে। প্রতিদিন অন্তত তিনটি থেকে চারটি ক্লাস নিয়ে তিনি প্রমাণ করছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা আসলে মনের জোরের কাছে অতি তুচ্ছ।
৩৫ বছর বয়সী এই উদ্যমী মানুষটি মনে করেন, নিজেকে দুর্বল ভাবাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। জামালপুর সদর উপজেলার রণরামপুর গ্রামের কৃষক মো. মোবারক আলী ও মরহুমা সাজেদা খাতুনের ছয় সন্তানের মধ্যে শামসুল তৃতীয়। জন্মের পর থেকে চোখের আলো না থাকলেও দমে যাননি তিনি। চিকিৎসার অনেক চেষ্টা ব্যর্থ হলেও পরিবারের দারিদ্র্য ডিঙিয়ে তিনি পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানকার একটি মিশনারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে ভর্তি হন ময়মনসিংহের এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশনে। ২০০৬ সালে সেখান থেকে এসএসসিতে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হন। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর তাঁর সামনে খুলে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার। ২০১২ সালে ইতিহাস বিভাগ থেকে ৩.২৯ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক এবং পরের বছর ৩.৭৬ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।
শামসুল ইসলামের এই দীর্ঘ পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন বড় ভাই কামরুল হাসানের কথা, যিনি তাঁর পড়াশোনায় ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় চমক ছিল ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষা। শিক্ষা ক্যাডারে ইতিহাস বিভাগে মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেন তিনি। তাঁর প্রস্তুতির গল্পটাও বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাইরা তাঁকে বই পড়ে শোনাতেন এবং তা রেকর্ড করে দিতেন। সেই অডিও শুনে শুনেই পড়াশোনা আয়ত্ত করতেন শামসুল। বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষায় তিনি শ্রুতলেখকের সাহায্য নেন। আর মৌখিক পরীক্ষায় তো রীতিমতো চমকে দিয়েছিলেন বোর্ড সদস্যদের। দীর্ঘ ৪০ মিনিটের জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন পরীক্ষকরা।
পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই ধ্যানজ্ঞান মনে করেন এই মেধাবী তরুণ। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়। সেখানে চার বছর কাটিয়ে ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট থেকে তিনি নেত্রকোনা সরকারি কলেজে কর্মরত আছেন। শুধু কর্মক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি এক দায়িত্বশীল মানুষ। ২০১২ সালে আসমা খাতুনকে বিয়ে করেন তিনি। বর্তমানে তাঁদের সংসারে রয়েছে তিন পুত্রসন্তান। স্ত্রী আসমা খাতুনের ভাষায়, ‘তিনি তাঁর নিজের প্রায় সব কাজই একাই করতে পারেন, এমনকি সন্তানদের দেখাশোনাতেও তাঁর কমতি নেই। চোখের আলো না থাকলেও তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও প্রখর মেধা দিয়ে তিনি সবকিছু অনুভব করেন।’
সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে শামসুল ইসলাম এক অনুপ্রেরণার নাম। নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. কবির উদ্দিন তাঁকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘শামসুল ইসলামের কাজ দেখে আমরা কখনো মনে করি না তাঁর কোনো সীমাবদ্ধতা আছে। বরং তাঁর মেধা ও একাগ্রতা থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার আছে। তিনি নিজের কোনো প্রতিবন্ধকতাকেই কখনো কাজের অজুহাত হিসেবে দাঁড় করান না।’ প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিদিন নতুন নতুন উপায়ে শিক্ষার্থীদের শেখানোর পথ খুঁজে নিচ্ছেন এই আদর্শ শিক্ষক, যা সমাজ ও আগামীর তরুণদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/xwl2snrvkx