গণিত বিশ্বের বাঘা বাঘা পণ্ডিতদের তাক লাগিয়ে এক অবিশ্বাস্য ঘোষণা দিয়েছে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। প্রায় এক শতাব্দী ধরে যে গাণিতিক সমস্যাটি বাঘা বাঘা গণিতবিদদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় তার সমাধান করে ফেলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বিপুল অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগের পর ওপেনএআই দাবি করেছে, তারা ‘নাভিয়ার-স্টোকস’ (Navier-Stokes) সমস্যার জট খুলতে সক্ষম হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই সমস্যাটি বিশ্বের সাতটি কঠিনতম গাণিতিক সমস্যার একটি, যা ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম’ হিসেবে স্বীকৃত। ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের ১০ হাজার এআই এজেন্ট বা স্বয়ংক্রিয় রোবট একযোগে কাজ করে এই অসাধ্য সাধন করেছে। তবে এই জয়জয়কারের মাঝেই দানা বেঁধেছে নতুন বিতর্ক।
ওপেনএআই-এর এই দাবিকে ঘিরে শুরু হয়েছে বাদানুবাদ। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত গণিতবিদ ট্রিস্টান বাকমাস্টার এক বিস্ফোরক দাবি তুলেছেন। তিনি জানান, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের একজন গবেষকের সঙ্গে তিনি নিজেও এই একই সমস্যার সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। তার আশঙ্কা, ওপেনএআই তড়িঘড়ি করে নিজেদের গবেষণার গতি বাড়িয়ে এই ঘোষণা দিয়েছে।
বাকমাস্টারের অভিযোগের তির ওপেনএআই-এর ‘কোডেক্স’ মডেলের দিকে। তিনি জানান, তাদের অসম্পূর্ণ গবেষণার ডেটা কোডেক্স প্ল্যাটফর্মে জমা ছিল, যা মূলত কোড লেখার জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে ওপেনএআই-এর গবেষকদের পক্ষে সেই তথ্য হাতিয়ে নেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। যদিও তিনি সরাসরি কাউকে চুরির দায়ে অভিযুক্ত করেননি, তবে নিজের ওয়েবসাইটে তিনি এই বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
পাল্টা জবাবে ওপেনএআই-এর গবেষক সেবাস্টিয়ান বুবেক সাফ জানিয়েছেন, তারা কারো ব্যক্তিগত সার্ভার বা গবেষণার তথ্য ব্যবহার করেননি। তবে তারা এটুকু স্বীকার করেছেন যে, অন্য গণিতবিদরা এই সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন—এমন খবর পাওয়ার পরই তারা প্রজেক্টটির গতি বাড়িয়েছিলেন। এমনকি ওই গবেষকদের ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের মডেলে কোনো ডেটা এসে থাকলে, তা সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে বলে তারা পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছেন।
ওপেনএআই জানিয়েছে, এই সমাধানের নেপথ্যে কাজ করেছে তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী ও গোপন এক এআই সিস্টেম, যা বর্তমানে আলোচনায় থাকা জিটিপি-৬ অ্যাস্ট্রা মডেলের চেয়েও কয়েক গুণ শক্তিশালী। এই ‘সুপার’ এআই সিস্টেমের ১০ হাজার এজেন্ট মাত্র ৮৮ ঘণ্টায় নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যার নিখুঁত সমাধান বের করে আনে।
গবেষকদের মতে, তাদের মূল লক্ষ্য বিজ্ঞানকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং মানবজাতির উপকার করা। ভবিষ্যতে এআই কতটা বিস্ময়কর হতে পারে, এই ঘটনা তারই একটি ঝলক মাত্র। এ বছরের শুরুতে তারা ৮০ বছরের পুরোনো একটি অঙ্ক মেলাতে সক্ষম হয়েছিল এবং গুগল ডিপমাইন্ডও গণিতে বড় সাফল্যের খবর দিয়েছে। তবে নাভিয়ার-স্টোকসের এই সমাধানকে বিগত এক বছরের সেরা সাফল্য হিসেবে দেখছেন ট্রিস্টান বাকমাস্টার নিজেও।
নাভিয়ার-স্টোকস সমস্যাটি মূলত তরল বা বায়বীয় পদার্থের গতির সমীকরণ নিয়ে কাজ করে। বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন ছিল, বাতাস বা পানির মতো প্রবাহীর গতিপথ বোঝাতে যে সমীকরণগুলো ব্যবহার করা হয়, কোনো চরম বা বিশেষ পরিস্থিতিতে সেগুলো কি অকেজো হয়ে যায়? ওপেনএআই-এর প্রমাণ বলছে, হ্যাঁ, যখন তরলের গতি অস্বাভাবিক পর্যায়ে বেড়ে যায়, তখন এই সমীকরণগুলো আর কার্যকর থাকে না। এই জটিল সমাধানটি যাচাই করতে জিটিপি-৬ অ্যাস্ট্রা মডেলের সময় লেগেছে প্রায় ১৭ ঘণ্টা।
সহস্রাব্দের সাতটি অমীমাংসিত সমস্যার যেকোনো একটি সমাধান করতে পারলে ‘ক্লে ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউট’ থেকে ১০ লাখ ডলার পুরস্কার পাওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্যের লক্ষ্য নিয়ে আগাতে থাকা ওপেনএআই জানিয়েছে, তারা এই পুরস্কারের টাকা দাবি করবে না।
সাফল্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ‘হাগিং ফেস’ নামক প্ল্যাটফর্মে এআই এজেন্টের হ্যাকিং কাণ্ডের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন আইনপ্রণেতারাও মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ তৈরি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি মানুষের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।