
সাতটি পাহাড়ি ছড়া থেকে বনের নাম হয়েছিল সাতছড়ি। এখন সেই ছড়াগুলোর চারটির অস্তিত্বই নেই। যে তিনটি ছড়া দৃশ্যমান, সেগুলোতেও পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে। বনের পুকুরগুলোও বালু ও পলিমাটিতে ভরাট হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আগামী শুষ্ক মৌসুমে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে প্রাণীদের পানির সংকট দেখা দিতে পারে।হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ি এলাকায় ২৪৩ হেক্টর বা প্রায় ৬০০ একরজুড়ে সাতছড়ি উদ্যান। ২০০৫ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পায় সাতছড়ি।মিশ্র চিরসবুজ ও পাতাঝরা বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই বনের ভেতর একসময় ছোট–বড় তিনটি পুকুর ছিল। পুকুরের টলমলে পানিতে তৃষ্ণা মেটাতে সেখানে আসত হরিণসহ নানা বন্য প্রাণী। পাহাড়ি ঢল ও বালুর স্রোতে ধীরে ধীরে দুটি পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। বাকি পুকুরটিরও তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। বনের ভেতরের কয়েকটি পাহাড়ি ছড়ার অবস্থাও নাজুক। সাতছড়ির বর্তমান এই অবস্থা প্রথম আলোর কাছে তুলে ধরেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কথা বলেছে প্রথম আলো। এই প্রতিবেদকও ১৪ সেপ্টেম্বর সাতছড়ি বনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেছেন।.স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাতছড়ি বনে পানির সংকট তীব্র হলে বন্য প্রাণী লোকালয়ে চলে এলে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে সংঘাত বাড়তে পারে। শিকারিদের কবলেও পড়তে পারে বিপন্ন প্রাণী।বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাতছড়িতে রয়েছে ২০০টির বেশি প্রজাতির গাছ। শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, ডুমুর, জাম, জামরুল, বাঁশ, বেতসহ নানা প্রজাতির উদ্ভিদ এখানে রয়েছে। বনের জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ। সাতছড়িতে প্রায় ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তুর বসবাস। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬ প্রজাতির উভচর। রয়েছে দেড় শতাধিক প্রজাতির পাখিও।উল্লুক, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মায়া হরিণ, মেছো বাঘসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাস এই বনে। পাখির মধ্যে ধনেশ, কাঠঠোকরা, বনমোরগ, লালমাথা ট্রগনসহ নানা প্রজাতি রয়েছে।বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, বনের জলাধারগুলো শুধু প্রাণীর তৃষ্ণা মেটায় না, বনের স্বাভাবিক পরিবেশ, ব্যাঙ, কীটপতঙ্গের প্রজনন এবং খাদ্যের জোগানসহ পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে। এমনিতেই সাতছড়িতে পানির উৎস কম। বন্য প্রাণী ও বনের স্বার্থে পুকুর পুনঃখননসহ সংস্কার করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।.বালু-পলিমাটিতে ভরাট জলাধারসরেজমিনে ১৪ সেপ্টেম্বর উদ্যানে দেখা যায়, সাতছড়ি বন কার্যালয়ের উত্তর দিকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে ১০ শতক আয়তনের পুকুরটি ভরাট হয়ে আছে। উদ্যানের প্রবেশপথ থেকে পূর্ব-উত্তর দিকে ৩০০ মিটার দূরে প্রায় ১২ শতক আয়তনের পুকুরটিরও একই অবস্থা। ওয়াচ টাওয়ারের পশ্চিম দিকে বনের গহিনে ১৫ শতক আয়তনের আরেকটি পুকুর রয়েছে, সেখানে পানি আছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে পুকুরের গভীরতা একেবারে কমে গেছে।সাতছড়ি চা-বাগান এলাকায় বিজিবি ক্যাম্পের পাশে দিয়ে বয়ে যাওয়া ছড়া এবং সাতছড়ি টাওয়ারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আরেকটি ছড়া দৃশ্যমান থাকলেও পাহাড়ি বালুতে হারিয়ে যেতে বসেছে। বনের টিপরাপল্লির সামনে থেকে বয়ে যাওয়া ছড়াটি সুরমা চা-বাগান ও নোয়াপাড়া চা-বাগান হয়ে সুতাং নদে গিয়ে মিশেছে। এটি বনের বড় ছড়া হিসেবে পরিচিত। সেটিও প্রায় শুকিয়ে গেছে।সাতছড়ি টিপরাপল্লির প্রধান এবং বাংলাদেশ টিপরা কল্যাণ সংঘের সিলেট বিভাগীয় কমিটির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন বর্মা প্রথম আলোকে বলেন, সাতছড়ির নামকরণ হয়েছিল সাতটি ছড়া থেকে। এখন সেই সাতটি ছড়ার মধ্যে দু–তিনটির অস্তিত্ব থাকলেও পানি নেই বলেই চলে। বৃষ্টি হলে ছড়াগুলোতে এক-দুই ঘণ্টা পানি দৃশ্যমান থাকলেও পরে শুকিয়ে যায়।.সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের দায়িত্বে থাকা মৌলভীবাজারের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার গত জুলাই মাসে বন বিভাগে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের কয়েকটি জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বন্য প্রাণীর পানির সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জলাধারগুলোর পানি ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধার, বিকল্প পানির উৎস স্থাপনে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।জাতীয় এই উদ্যানে আরও পুকুর খননের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন বন বিভাগের সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোবারক হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জলাধারগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাতছড়ির জলাধার পুনঃখনন শুধু বন্য প্রাণীর পানি সরবরাহের বিষয় নয়; এটি পুরো বনের প্রতিবেশ রক্ষার সঙ্গে জড়িত। একটি বনের গাছপালা, মাটি, পানি, পাখি, কীটপতঙ্গ, উভচর ও স্তন্যপায়ী প্রাণী পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল।বনে পানির ব্যবস্থা না থাকলে আশপাশের মানুষও সংকটে পড়বেন। বনের চাকলাপুঞ্জি এলাকার বাসিন্দা মনির মিয়া বলেন, বনের ভেতরে পানি থাকলে সব প্রাণী সেখানেই থাকে। পানি না থাকলে সেগুলো লোকালয়ের দিকে চলে আসতে পারে। এতে প্রাণীগুলো যেমন বিপদে পড়বে, তেমনি মানুষও আতঙ্কে থাকবে।.বনে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে হবেসম্প্রতি সিলেট বিভাগের বিভিন্ন বনাঞ্চল ঘুরে এসেছেন বন্য প্রাণী, চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কের বিশেষজ্ঞ রেজা খান। সাতছড়ি বনের পানির উৎসের বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সিলেট বিভাগের বনগুলোর মধ্যে এখন সবচেয়ে কম ছড়া দেখা যায় সাতছড়িতে। বনের রেস্টহাউসের পাশ দিয়ে যাওয়া ছড়াটি ছিল প্রধান ছড়া। সেটিও এখন মরা ছড়ায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বনের ভেতরে থাকা পুকুরগুলো রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সেগুলোও ভরাট হয়ে গেছে।বনের আশপাশের এলাকা থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে সৃষ্ট ভূমিক্ষয় থেকে জলাধারগুলো ভরাট হয়ে গেছে বলে জানান রেজা খান। তিনি বলেন, শুষ্ক মৌসুমে প্রাণীদের পানির চাহিদা মেটাতে সাতছড়ি বনের পুকুরগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বনের পরিবেশের ক্ষতি না করে আরও কয়েকটি পুকুর খনন করা দরকার। পুকুরগুলোর পাড় খাড়া না করে এমনভাবে ঢালু করা করা উচিত, যাতে বিভিন্ন প্রাণী সহজেই পানির কাছে পৌছাতে পারে। পুকুরগুলোতে যাতে সারা বছর পানি থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/xqp88czja2