
ইসলামে বিনিয়োগের ধারণা কেবল গুটিকয়েক ঝানু ব্যবসায়ী বা ধনীদের মুনাফা লাভের মাধ্যম নয়। বরং এটি পৃথিবীর বুকে একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধির সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গীকার। পবিত্র কোরআনে মানুষের এই দায়বদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, “তিনিই তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানে তোমাদের বসতি স্থাপন ও তা আবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন।” (সুরা হুদ, আয়াত: ৬১)। যখন একজন মানুষ ইসলামের বিধান মেনে তার কষ্টার্জিত অর্থ উৎপাদনশীল কোনো খাতে খাটায়, কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং সমাজকে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে, তখন সেই ব্যবসায়িক উদ্যোগটি আর কেবল বৈষয়িক থাকে না; তা রূপ নেয় এক জীবন্ত ইবাদতে।
শেয়ারবাজার, বন্ড বা অন্য কোনো ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগের আগে একজন বিশ্বাসী মানুষের মনে স্বচ্ছ উদ্দেশ্য থাকা জরুরি। কোরআনের দর্শন হলো জাগতিক প্রাচুর্যকে পরকালের কল্যাণে বিনিয়োগ করা। ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে পরকালের কল্যাণ অনুসন্ধান করো, তবে দুনিয়া থেকে তোমার ন্যায্য অংশটুকু নিতে ভুলো না; আর মানুষের প্রতি তেমন সুন্দর আচরণ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৭)। এই মূলনীতির আলোকে একজন সচেতন মানুষের বিনিয়োগের পেছনে মূলত তিনটি লক্ষ্য কাজ করে:
যেকোনো সম্পদে বিনিয়োগের আগে নিজের আর্থিক ভিত্তিটি মজবুত করা প্রয়োজন। অপরিকল্পিত ঝুঁকি এড়াতে তিনটি প্রাথমিক ধাপ অনুসরণ করা উচিত:
১. কলুষমুক্ত হওয়া: বিনিয়োগের আগে সব ব্যক্তিগত দেনা শোধ করা এবং অতীত জীবনের সুদি বা হারাম লেনদেন থেকে তওবা করে বেরিয়ে আসা বাধ্যতামূলক। রাসুল (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী, হালাল উপার্জনের পথেই প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।
২. আপৎকালীন তহবিল: জমানো সব টাকা একবারে ব্যবসায় ঢেলে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। পরিবারে হঠাৎ কোনো সংকট বা অসুস্থতার মোকাবিলায় অন্তত ৩ থেকে ৬ মাসের মৌলিক খরচের সমপরিমাণ টাকা ‘জরুরি তহবিল’ হিসেবে আলাদা রাখা উচিত। পাশাপাশি জাকাত প্রদানের মাধ্যমে নিজের অর্থকে পবিত্র রাখা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। কোরআনের ভাষায়, “নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭)।
৩. শ্রমের মর্যাদা: সৎপথে পরিশ্রমের মাধ্যমে সঞ্চিত মূলধনই হলো বিনিয়োগের আসল শক্তি। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনো খাবার মানুষ কখনো গ্রহণ করেনি।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১৩৮)।
যারা সরাসরি ব্যবসা পরিচালনার ঝুঁকি নিতে পারেন না, তাদের জন্য ইসলামি অর্থনীতিতে বেশ কিছু আধুনিক ও কার্যকর মাধ্যম রয়েছে:
ইসলামি বাণিজ্য আইনের মূল প্রাণ হলো ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা। কোরআনে বলা হয়েছে, “হে বিশ্বাসীরা, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যে ব্যবসা পরিচালিত হয়, তা বৈধ।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)। নবীজি (সা.) যেকোনো ধরনের ধোঁকা বা অস্পষ্ট লেনদেন (গারার) থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ বিনিয়োগ হতে হবে বাস্তবসম্মত ও পরিষ্কার। যাবতীয় সাবধানতা অবলম্বনের পর ফলাফল অর্পন করতে হবে আল্লাহর ওপর। আল্লাহ বলেছেন, “অতঃপর যখন তুমি দৃঢ় সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)।
ইসলামে আর্থিক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি হলো নিয়ত। রাসুল (সা.) স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)। মানুষের প্রতিটি কাজের ফল নির্ভর করে তার উদ্দেশ্যের ওপর। যখন কেউ পরোপকার ও হালাল জীবিকার উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে, তখন তার সম্পদে অভূতপূর্ব বরকত নেমে আসে।
পবিত্র কোরআনে এই বরকতের চমৎকার উপমা দেওয়া হয়েছে: “যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেদের ধনসম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি শস্যবীজের মতো—যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায় এবং প্রতিটি শিষে একশত করে শস্যদানা থাকে; আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহু গুণে বাড়িয়ে দেন, তিনি প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬১)।
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/gf30ie0vwk