
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাছের বাজারে এখন আর ইলিশের সেই চেনা রুপালি উৎসব নেই। দোকানের থালায় ইলিশ সাজিয়ে ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন বিক্রেতারা, কিন্তু দাম শুনেই থমকে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বেসরকারি চাকরিজীবী আলতাফ হোসেনের অভিজ্ঞতাই তার বড় প্রমাণ। গত বছর যে ওজনের ইলিশ তিনি ১,৮০০ টাকায় কিনেছিলেন, এবার সেই এক কেজির মাছের দাম চাওয়া হচ্ছে ২,৪০০ টাকা। শেষমেশ বাজেটে না কুলায় বড় মাছের স্বপ্ন ছেড়ে ছোট দুটি মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হলো তাকে।
মাছ ব্যবসায়ী শুক্কুর আলী, যিনি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তিনিও অবাক এবারের বাজার পরিস্থিতি দেখে। তিনি জানান, এবার ১ কেজির নিচে কোনো ইলিশ ২,২০০ টাকার কমে বিক্রি করা যাচ্ছে না। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের ছোট ইলিশ কিনছেন, যার চাহিদা এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ইলিশের এই অগ্নিমূল্যের পেছনে রয়েছে আহরণ বা উৎপাদন কমে যাওয়া। প্রখ্যাত ইলিশ গবেষক মো. আনিছুর রহমান এই পরিস্থিতিকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গবেষকদের মতে, মূলত চারটি কারণে ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে:
ইলিশের রাজধানীখ্যাত চাঁদপুরের চিত্র আরও করুণ। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল বারী জমাদারের মতে, তিন বছর আগেও যেখানে মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার মণ ইলিশ আসত, এখন তা ২৫০ মণে ঠেকেছে। একই অবস্থা পটুয়াখালীর মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রেও। ট্রলার মালিক ফজলু গাজী জানান, আগে যেখানে ট্রলারগুলো সাগর থেকে ২০-৪০ মণ মাছ নিয়ে ফিরত, এখন অধিকাংশ ট্রলারই খালি হাতে ফিরছে। সাগরে ঘনঘন আবহাওয়ার সতর্কসংকেতও ইলিশ ধরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত কয়েক বছরের বাজার দর পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২২ সালের পর থেকে ইলিশের দাম লাগামহীন হয়ে পড়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী:
হিসাব অনুযায়ী, গত চার বছরে ইলিশের গড় দাম বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২.৯৫ লাখ টন, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৫.৭১ লাখ টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু এরপর থেকেই নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই উৎপাদন হ্রাসের হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদের গবেষণা আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিচ্ছে। তিনি জানান, আগে ধরা পড়া মাছের ৫০ শতাংশের পেটে ডিম পাওয়া যেত, যা এখন ২০-৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বড় ও পরিপক্ক ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, আমাদের সাগরের ‘ইলিশের গোলাঘর’ আজ হুমকির মুখে, যা রক্ষায় এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।