কল্পনা করুন এমন এক পৃথিবীর কথা, যেখানে পারমাণবিক যুদ্ধের কালো ধোঁয়া আকাশ ঢেকে দিয়েছে, কিংবা কোনো বিশাল গ্রহাণুর আঘাতে টালমাটাল গোটা বিশ্ব। এমন মহাবিপর্যয়ে যখন পৃথিবীর বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, তখন জীবন বাঁচাতে মানুষের শেষ গন্তব্য কোথায় হতে পারে? সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, মহাপ্রলয়ের সেই দুঃসময়ে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে নিরাপদ স্বর্গ হতে পারে অস্ট্রেলিয়া।
জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব হ্যাগেনের গবেষক ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেন-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। গবেষকরা এমন সব পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেছেন, যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১০ শতাংশ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে সক্ষম। পারমাণবিক যুদ্ধ, বড় ধরনের আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত কিংবা গ্রহাণুর আঘাতের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কোন দেশগুলো টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে, সেটিই ছিল গবেষণার মূল বিষয়। গত ২৩ আগস্ট ‘গ্লোবাল চ্যালেঞ্জেস’ জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।
গবেষক দলটি মূলত তিন ধরনের বড় বিপদের কথা উল্লেখ করেছেন:</
গবেষণার তথ্যমতে, বড় কোনো বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে এবং বিশ্বজুড়ে চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। ফ্লোরিয়ান উলরিখ জেন-এর মতে, "বিপর্যয় পরবর্তী সময়ে খাদ্য নিরাপত্তাই হবে টিকে থাকার প্রধান চাবিকাঠি।"
অস্ট্রেলিয়া এই দৌড়ে এগিয়ে থাকার কারণ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতা। দেশটি উত্তর গোলার্ধের পারমাণবিক যুদ্ধপ্রবণ এলাকাগুলো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এছাড়া দেশটির রয়েছে শক্তিশালী জ্বালানি ব্যবস্থা, বৈচিত্র্যময় জলবায়ু এবং বিশাল পরিমাণে উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনের ক্ষমতা। এমনকি বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও অস্ট্রেলিয়া নিজের নাগরিকদের খাদ্যের জোগান দিতে সক্ষম হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স, ভারত বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ায় যুদ্ধের সময় তারা সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ফলে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, দক্ষিণ গোলার্ধে আগ্নেয়গিরির সংখ্যা কম এবং বিশাল মহাসাগরগুলো এখানকার জলবায়ুকে চরম বিপর্যয়ের সময়ও কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
নিরাপদ দেশের তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার পরেই রয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও নিউজিল্যান্ড। তবে নিউজিল্যান্ড কিছুটা পিছিয়ে আছে কারণ সেখানে জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ও সুনামির ঝুঁকি বেশি। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় প্রচুর খাবার উৎপাদন হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বৈষম্য তাদের পিছিয়ে দিয়েছে। তুষারশীতল আইসল্যান্ড তালিকায় থাকলেও সূর্যের আলো না পৌঁছালে চরম ঠান্ডায় দেশটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ার ভয় রয়েছে। অন্যদিকে, আমেরিকা এই তালিকায় অনেক নিচে অবস্থান করছে তার ভৌগোলিক ও কৌশলগত ঝুঁকির কারণে।
গবেষকদের মতে, কেবল সম্পদ থাকলেই হবে না, বিপর্যয় সামলাতে প্রয়োজন দক্ষ শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক সমতা। দেশে বৈষম্য বেশি থাকলে দুর্যোগের সময় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা সরকারের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন, মহাবিপর্যয়ের ঝুঁকিগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে এবং জরুরি অবকাঠামো রক্ষায় এখনই আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বাস্তবসম্মত বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া উচিত। কারণ, যখন বিপর্যয় শুরু হবে, তখন নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।