
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত কেবল একটি মানচিত্র বদলের গল্প ছিল না; বরং তা ছিল এক পরাধীন ও বিশৃঙ্খল জনপদকে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার মহিমান্বিত সূচনা। তৎকালীন মদিনা ছিল নানা ধর্মের মানুষের আবাসস্থল, যেখানে আউস ও খাজরাজ গোত্র দুটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সেই উত্তাল সময়ে শান্তির দূত হয়ে মদিনার মাটিতে পা রাখলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
তিনি মদিনাবাসীকে প্রথম কী বার্তা দিয়েছিলেন? পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণে তিনি মাত্র চারটি মূলনীতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মদিনার বিখ্যাত ইহুদি পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.), যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, "আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন মদিনায় পৌঁছালেন, মানুষ তাঁকে এক পলক দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ভিড় জমালো। আমিও সেই ভিড়ে শামিল হলাম। তাঁর নূরানি চেহারার দিকে তাকিয়েই আমার অন্তরাত্মা বলে উঠল—এই পবিত্র মুখচ্ছবি কোনো মিথ্যাবাদীর হতে পারে না।"
জনসমুদ্রের উদ্দেশে নবীজি (সা.) তাঁর জীবনের প্রথম যে কালজয়ী বাণীটি উচ্চারণ করলেন, তা হলো: "হে লোকসকল! তোমরা ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও, সমাজে সালামের ব্যাপক প্রচার ঘটাও, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখো এবং রাতে যখন মানুষ গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন তোমরা নামাজ (তাহাজ্জুদ) আদায় করো; তবেই তোমরা পরম শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।" (সুনানে তিরমিজি: ২৪৮৫)
১. ক্ষুধার্তকে অন্নদান: সামাজিক নিরাপত্তার রক্ষাকবচ
একটি আদর্শ সমাজ গঠনের প্রাথমিক শর্ত হলো মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা। পেটে ক্ষুধা নিয়ে নৈতিকতা বা সংস্কৃতির চর্চা অসম্ভব। নবীজি (সা.) জানতেন, অভাব দূর না হলে সমাজে অপরাধ ও সংঘাত থামানো যাবে না। অন্নসংস্থানকে তিনি নিছক দান হিসেবে নয়, বরং সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যাতে রাষ্ট্রের কেউ অনাহারে না থাকে।
২. সালামের প্রসার: আস্থার সেতুবন্ধন
চলাফেরায়, কর্মস্থলে বা সামাজিক যেকোনো মেলবন্ধনে একে অপরকে অভিবাদন জানানো কেবল শিষ্টাচার নয়, এটি হৃদয়ের দূরত্ব ঘোচানোর অব্যর্থ ওষুধ। 'আসসালামু আলাইকুম'—এর অর্থ হলো অন্যের নিরাপত্তা ও শান্তি কামনা করা। এই ছোট একটি বাক্য মানুষের মাঝ থেকে ভয় ও বিদ্বেষ দূর করে আস্থার বন্ধন তৈরি করে।
৩. আত্মীয়তার বন্ধন: মজবুত সামাজিক কাঠামো
পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। পরিবার যখন ভেঙে যায়, তখন গোটা সমাজই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। নবীজি (সা.) রক্তের সম্পর্ক রক্ষা করাকে সামাজিক ঐক্যের চাবিকাঠি হিসেবে দেখিয়েছেন। স্বজনদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো সমাজকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষা করে।
৪. রাতের নিভৃত প্রার্থনা: আত্মিক শক্তির উৎস
উপরের তিনটি কাজ ছিল সামাজিক দায়িত্ব, আর চতুর্থটি হলো আত্মিক পরিশুদ্ধি। নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, রাতের আঁধারে স্রষ্টার সান্নিধ্যে যারা চোখের পানি ফেলে নিজের অহংকার বিসর্জন দেয়, দিনের আলোয় তারাই নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা করতে পারে। আত্মিক সংযোগ ছাড়া কেবল বৈষয়িক সমাজসেবা কখনও দীর্ঘস্থায়ী বা নিষ্কাম হতে পারে না।
মক্কা থেকে মদিনার এই যাত্রা আজতক বিশ্ববাসীর জন্য এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়ার চিরন্তন দিকনির্দেশনা হয়ে আছে।
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/tban83fg8a