
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের জয়যাত্রায় উন্মোচিত হয়েছে এক বিস্ময়কর দিগন্ত। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে প্রমাণ করেছেন যে, প্রার্থনার সময় মানুষের হৃদয়ে যে প্রশান্তি অনুভূত হয়, তা কেবল কোনো আবেগীয় অনুভূতি নয় বরং মস্তিষ্কের একটি নিরেট শারীরিক বাস্তবতা। বিশেষ করে যখন কোনো মানুষ স্রষ্টার আরাধনায় মগ্ন হন, তখন তার মস্তিষ্ক কীভাবে এক জীবন্ত সংলাপে সাড়া দেয়, তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়।
যুক্তরাষ্ট্রের টমাস জেফারসন ইউনিভার্সিটি হসপিটালের প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী ডা. অ্যান্ড্রু নিউবার্গ দীর্ঘকাল ধরে মানুষের মস্তিষ্কের ওপর ধর্মীয় প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বিশেষ প্রযুক্তির ‘স্পেক্ট’ (SPECT) স্ক্যান ব্যবহার করে মুসলিম ইমাম, ক্যাথলিক নান, তিব্বতি সন্ন্যাসী এবং এমনকি স্রষ্টায় অবিশ্বাসী ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এই স্ক্যানে ক্ষতিকর প্রভাবহীন তেজস্ক্রিয় উপাদান প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে—প্রার্থনার সময় মস্তিষ্কের ঠিক কোন অংশে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে। গবেষণায় প্রধানত ‘ফ্রন্টাল লোব’ এবং ‘প্যারাইটাল লোব’ নামক দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে অভাবনীয় পরিবর্তন ধরা পড়েছে।
মানুষের কপালে ঠিক পেছনে অবস্থিত ‘ফ্রন্টাল লোব’ হলো পুরো মস্তিষ্কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে মস্তিষ্কের ‘সিইও’ বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলা হয়। মানুষের ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণ এবং গভীর মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র এটি। মজার বিষয় হলো, যখন আমরা কোনো রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে কথা বলি বা কারো কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি, তখন এই অংশটি অত্যন্ত সক্রিয় থাকে।
ডা. নিউবার্গের গবেষণায় দেখা গেছে, যখন একজন বিশ্বাসী মানুষ নামাজে দাঁড়ান বা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তখন তার ফ্রন্টাল লোবে রক্তপ্রবাহ এবং স্নায়বিক উদ্দীপনা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। স্ক্যান রিপোর্ট অনুযায়ী, একজন মানুষ যখন নিবিষ্ট মনে প্রার্থনা করেন, তখন তার মস্তিষ্ক অদেখা স্রষ্টাকে কোনো কাল্পনিক বস্তু মনে করে না। বরং পার্থিব কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি কথা বললে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো ঠিক যেভাবে সাড়া দেয়, প্রার্থনার সময়ও অবিকল একই প্রতিক্রিয়া দেখায়। অর্থাৎ, বিশ্বাসীর মস্তিষ্ক স্রষ্টার সঙ্গে এই কথোপকথনকে বাস্তব একটি সংলাপ হিসেবেই গ্রহণ করে।
মস্তিষ্কের পেছনের অংশে থাকা ‘প্যারাইটাল লোব’ আমাদের পারিপার্শ্বিক জগৎ এবং নিজের শারীরিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন রাখে। আমরা কোথায় আছি বা আমাদের চারপাশের পরিবেশ কেমন, সেই সংকেতগুলো এই অংশটিই প্রসেস করে। কিন্তু প্রার্থনার এক গভীর পর্যায়ে পৌঁছালে এই অংশের সক্রিয়তা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রার্থনায় যখন মানুষ পার্থিব সব কোলাহল ভুলে নিজেকে বিলীন করে দেয়, তখন মস্তিষ্ক বাইরের সব সংবেদনশীল তথ্য গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে মানুষ তার জাগতিক সীমাবদ্ধতা ও অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে এক অসীম প্রশান্তিতে নিমগ্ন হয়। ইসলামি পরিভাষায় একেই বলা হয় ‘খুশু-খুজু’, যা মানসিক উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা দূর করতে মহৌষধ হিসেবে কাজ করে।
গবেষণার একটি কৌতূহলী দিক ছিল নাস্তিক বা সংশয়বাদীদের ওপর করা পরীক্ষা। ডা. নিউবার্গ লক্ষ্য করেন, অবিশ্বাসী ব্যক্তিরা যখন মেডিটেশন করেন বা ঈশ্বর নিয়ে ভাবেন, তখন তাদের ফ্রন্টাল লোবে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে না। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, একজন সংশয়বাদীর কাছে স্রষ্টার অস্তিত্ব যেহেতু অলীক বা শূন্য, তাই তাদের মস্তিষ্কের যোগাযোগের স্নায়বিক জালিকাগুলো স্রষ্টাকে ঘিরে সক্রিয় হতে পারে না। অন্যদিকে, একজন বিশ্বাসীর কাছে স্রষ্টা এক জীবন্ত মহাসত্য হওয়ার কারণে তার মস্তিষ্ক সেই অনুযায়ী সাড়া দেয় এবং দৈহিক ও মানসিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।
ডা. অ্যান্ড্রু নিউবার্গ তার ‘হোয়াই গড ওন্ট গো অ্যাওয়ে’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি যে ঈশ্বর ভাবনা মানুষের মানসিক সুস্থতা ও আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের মস্তিষ্কের গঠনে পরিবর্তন না এলে ঈশ্বর ভাবনা কখনোই সমাজ থেকে মুছে যাবে না।
আজকের আধুনিক নিউরোসায়েন্স যা প্রমাণ করছে, পবিত্র কোরআন চৌদ্দশত বছর আগেই সেই ইঙ্গিত দিয়েছিল। সুরা ফুসসিলাতের ৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “অচিরেই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করব দূরদিগন্তে এবং তাদের নিজেদের শরীরের ভেতরেও; যাতে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে এই কোরআনই চূড়ান্ত সত্য। আপনার প্রতিপালক কি সব কিছুর ওপর প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যথেষ্ট নন?”
গবেষণার এই নির্যাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সুন্দর ইবাদত কেবল আধ্যাত্মিক তৃপ্তিই নয়, বরং শরীর ও মনের এক বিজ্ঞানসম্মত নিরাময় প্রক্রিয়া।
Source: https://www.prothomalo.com/religion/islam/dgwf0zn99z