নবীর আদর্শে জীবন গড়ার সাতটি অনন্য উপহার
একজন মুমিনের সাফল্যের মাপকাঠি ও জীবনের শ্রেষ্ঠ দিশারি হলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর জীবনদর্শন ও সুন্নাহ অনুসরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে পরকালীন মুক্তির গ্যারান্টি। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের পাতায় সুন্নাহ চর্চাকারীদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের ঘোষণা এসেছে। নবীর আদর্শকে জীবনের ভূষণ বানালে মিলবে এমন বিশেষ সাতটি সওগাত:
১. মহান আল্লাহর পরম ভালোবাসা লাভ
সুন্নাহ অনুসরণের সবচাইতে বড় সার্থকতা হলো খোদ স্রষ্টার ভালোবাসা অর্জন করা। সুরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।’ অর্থাৎ, কেবল মুখের দাবিতে ভালোবাসা প্রমাণিত হয় না; বরং নবীজির সুন্নাহর ছাঁচে জীবন গড়াই হলো আল্লাহর ভালোবাসার আসল পরীক্ষা। এর মাধ্যমে বান্দা যেমন আল্লাহর প্রিয় হয়ে ওঠে, তেমনি তার জীবনের গুনাহগুলোও মাফ হয়ে যায়।
২. এক শত শহীদের সওয়াব অর্জন
সমাজ যখন পাপাচার ও বিদআতে নিমজ্জিত থাকে, তখন কোনো একটি সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা অত্যন্ত কঠিন ও সাহসিকতার কাজ। রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘আমার উম্মতের ক্রান্তিকালে যে ব্যক্তি আমার কোনো সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, তার জন্য রয়েছে এক শত শহীদের সওয়াব।’ (বাইহাকি)। হারিয়ে যাওয়া কোনো সুন্নাহকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে পুনরুজ্জীবিত করা নবীর প্রতি গভীর মহব্বতেরই বহিঃপ্রকাশ।
৩. জান্নাতের নিশ্চিত প্রবেশাধিকার
জান্নাত পাওয়ার সহজ পথ হলো রাসুলের আনুগত্য। রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের প্রত্যেকেই জান্নাতে যাবে, তবে সে ছাড়া যে অস্বীকার করল।’ সাহাবিরা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কে অস্বীকার করবে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘যে আমার আনুগত্য করল সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে অবাধ্য হলো সেই মূলত জান্নাতকে অস্বীকার করল।’ (সহিহ বুখারি)। প্রতিটি ছোট ছোট সুন্নাহ পালনই মুমিনকে জান্নাতের জানালার কাছে নিয়ে যায়।
৪. পরকালে প্রিয় নবীর সাহচর্য
যাকে ভালোবাসা হয়, পরকালে তার সঙ্গই নসিব হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি নবীজির কাছে নিজের ভালোবাসা ব্যক্ত করলে তিনি বলেন, ‘তুমি তার সঙ্গেই থাকবে, যাকে তুমি ভালোবাসো।’ (সহিহ মুসলিম)। অন্য এক বর্ণনায় রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে আমার সুন্নাহকে ভালোবাসল সে প্রকৃতপক্ষে আমাকেই ভালোবাসল, আর যে আমাকে ভালোবাসল সে জান্নাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।’ (তিরমিজি)। নবীজির আখলাক ও আমলকে নিজের জীবনে ধারণ করাই হলো সেই ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ।
৫. শ্রেষ্ঠ মানুষদের দলভুক্ত হওয়া
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যকারীকে পরকালে নিঃসঙ্গ থাকতে হবে না। সুরা নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা এই পথে চলবে তারা নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গী হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। এটি এমন এক উচ্চমর্যাদা, যা কেবল সুন্নাহর অনুসারীরাই লাভ করতে পারেন। পরকালের বিভীষিকার মাঝে এই পুণ্যবান কাফেলার সান্নিধ্য হবে মুমিনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া।
৬. সাধারণ কাজকেও ইবাদতে রূপান্তর
সুন্নাহর এক অলৌকিক সৌন্দর্য হলো এটি সাধারণ জৈবিক কাজকেও সওয়াবের উসিলা বানিয়ে দেয়। বুখারি শরিফের প্রথম হাদিস অনুযায়ী, মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। একজন মুমিন যখন নবীজির শেখানো পদ্ধতিতে আহার করে, বিশ্রাম নেয় কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়, তখন সেই জাগতিক কাজগুলোও ইবাদত হিসেবে আমলনামায় যুক্ত হয়। সুন্নাহর স্পর্শে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তখন নেকিতে ভরপুর হয়ে ওঠে।
৭. সুন্নাহ প্রচারের দ্বিগুণ সওয়াব
নিজে আমল করার পাশাপাশি সুন্নাহর আলো অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মাঝেও রয়েছে বড় প্রাপ্তি। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের পথ দেখাবে, সে ওই কাজ সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব পাবে।’ (সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ, আপনার অনুপ্রেরণায় যদি কেউ একটি সুন্নাহ পালন শুরু করে, তবে তার আমলের সওয়াব আপনার ঝুলিতেও যুক্ত হবে। এভাবেই সুন্নাহ প্রচারের মাধ্যমে সওয়াবে জারিয়া বা নিরবচ্ছিন্ন পুণ্যের ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব।
আসুন, জীবনের প্রতিটি ধাপে—পোশাকে, আচরণে ও ইবাদতে নবীজিকে অনুসরণের দৃঢ় সংকল্প করি। এই ছোট ছোট প্রচেষ্টাই হয়তো আমাদের জন্য নিয়ে আসবে মহিমান্বিত সেই সাতটি উপহার।
নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক
