
সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি জনপদ জঙ্গল সলিমপুর। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী এলাকাটি এখন তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু মাটির গভীরে চিত্রটা অন্যরকম। এম এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় সংলগ্ন এক দোকানি শাহ আলম জানান, তিনি বিদ্যুতের বিল মেটান স্থানীয় এক সংগঠনের রসিদে, পিডিবি বা সরকারি কোনো দপ্তরের দেখা সেখানে নেই। গত মার্চে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে ‘পুরো দখল’ নেওয়ার ঘোষণা দিলেও এই অদ্ভুত ব্যবস্থা আজও বহাল।
জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশপথে এখন পুলিশের তল্লাশিচৌকি আর দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প দৃশ্যমান। নিয়মিত টহলও চলে। কিন্তু গত ৪ আগস্ট সরেজমিনে দেখা গেছে, সেখানকার জনজীবন, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে। এলাকাভেদে পানির পাম্প চালানো আর পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণের নামে স্থানীয় চক্রই টাকা তুলছে। অথচ একসময় এই জনপদে ঢুকতে গেলে সশস্ত্র পাহারাদারদের অনুমতি লাগত, সেই দৃশ্য এখন নেই ঠিকই, কিন্তু ভয় কাটেনি মানুষের মন থেকে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) দেওয়া তথ্যমতে, পুরো এলাকায় বৈধ প্রধান সংযোগ মাত্র ২২টি। কিন্তু এই সামান্য সংযোগ থেকেই মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়েছে অসংখ্য অবৈধ সাব-লাইন। স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলমের ভাষায়, ‘সরকারি কোনো বিল পাই না। ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নামে রসিদ আসে, আর তাদের নিজস্ব অফিসে গিয়েই আমাদের টাকা জমা দিয়ে আসতে হয়।’ জানা গেছে, এই ২২টি সংযোগের বড় অংশই স্থানীয় প্রভাবশালী এবং মো. ইয়াসিন ও তার সহযোগীদের নামে। বকেয়া বিলের পরিমাণ বর্তমানে ৭২ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। পিডিবি কর্মীরা বৈধ-অবৈধ সংযোগ যাচাই করতে গিয়েও হিমশিম খাচ্ছেন, কারণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করলে সরকারি ক্যাম্প ও পানির পাম্পও বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী নেই, কিন্তু রাতের অন্ধকারে এখনো হানা দেয় সন্ত্রাসীরা। গত মে মাসে আলীনগরের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়, বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয় ক্যাম্পের একাংশ। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলাচলে বাধা দিতে রাস্তা পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে গত ২৬ জুলাই। পুলিশ ক্যাম্পের পানির পাইপে বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে দেয় অজ্ঞাত পরিচয় দুষ্কৃতীরা। সেই পানি পান করে তিন পুলিশ সদস্য অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, পাইপ কেটে ভেতরে বিষ বা কীটনাশক ঢোকানো হয়েছিল।
সরকারি রেকর্ডে জঙ্গল সলিমপুরের জমির হিসাব নিয়েও চলছে লুকোচুরি। ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি থাকার কথা থাকলেও বর্তমান জেলা প্রশাসকের হিসাবে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক হাজার একরে। এই ২০০০ একরের ব্যবধান নিয়ে নেই কোনো সদুত্তর। স্থানীয়দের দাবি, এখানে অন্তত ৩০টি পাহাড় কেটে প্রায় ২৬ হাজার ছোট ছোট প্লট তৈরি করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই মোটা অংকের টাকায় বিক্রি হয়ে গেছে। এই অবৈধ প্লট বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বিদ্যুৎ ও পানির সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থা।
আলীনগরের বাসিন্দাদের চোখেমুখে এখনো অনিশ্চয়তা। তাদের ভয়, পলাতক ডন মো. ইয়াসিন ও তার সহযোগীরা যে কোনো সময় ফিরে এসে আবার দখল নিতে পারে। রফিক উদ্দিন নামের এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, ‘এত পুলিশ আর ক্যাম্প থাকার পরও যদি সেখানে হামলা হয়, তবে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’ সরকারের কাছে তাদের আবেদন, উচ্ছেদ করার আগে যেন বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকাটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করলেও বিদ্যুৎ, পানি আর পাহাড় দখলদারদের প্রভাব জঙ্গল সলিমপুরকে এক রহস্যময় জনপদ হিসেবেই টিকিয়ে রেখেছে। প্রশাসনের নজরদারির মধ্যেই সেখানে এক অদ্ভুত সমান্তরাল ব্যবস্থার চাকা সচল রয়েছে, যা ভাঙতে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।
Source: https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/0ub82sw8u6